বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০৭ অপরাহ্ন৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

৩রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

নোটিশঃ
★করোনাভাইরাস থেকে হেফাজত থাকতে পড়ুন-'লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনায যোয়ালিমীন'।। ★সিলেটের বার্তায় প্রতিনিধি/সংবাদদাতা নিয়োগ চলছে। তাই যোগাযোগ করুন নিম্নের মেইল অথবা নাম্বারে।
ধর্ষণের প্রতিকার; বনাম নারীর দায়বদ্ধতা

ধর্ষণের প্রতিকার; বনাম নারীর দায়বদ্ধতা

মুফতি মুস্তফা সুহাইল হেলালী: চারদিকে চলছে যৌন হয়রানী। চলছে যৌন সন্ত্রাসীদের হামলা। খবরের কাগজে ফেসবুকের টাইমলাইনে একই খবর ‘ধর্ষণ’। মহামারী করোনা ভাইরাসের পর পরই এ যেনো আরেক ভাইরাসে ভাসছে দেশ। 

একজন ধর্ষিতা মানেই নির্যাতনের চরম শিখরে পৌঁছা এক নারী। একজন নারী এমন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর জালিম ধর্ষণকারীর শাস্তি নিশ্চিত করার আগে নারীর দোষ খোঁজা তার উপর আরেক অত্যাচার। নারীর দোষ খোঁজার এই ফাঁকে বেঁচে যায় একজন জালিম ধর্ষক এবং নির্যাতনের পর নির্যাতনের যাতাকলে একজন ধর্ষিতা নারীর জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠে। কেউ এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় এবং কেউ বেঁচেও মৃত জীবন কাটায়।

প্রশ্ন হলো, ধর্ষণের জন্য একজন নারীর দায়বদ্ধতা কতটুকু? শরীয়ত কি একজন নারীর চলাফেরাকে ধর্ষণের দায় হিসেবে দেখেছে? ধর্ষণ হলেই আমরা অনেক সময় ধর্ষকের শাস্তির পূর্বে নারীর চলাফেরা ইত্যাদিকে দায়ী করি, কুরআনে কি তা করা হয়েছে?

এর বিশ্লেষণে গেলে আমরা দেখবো যে, শরীয়ত নারী পুরুষ সবাইকে নিজ নিজ লজ্জাস্থান হেফাযতের বিধান দিয়েছে, দিয়েছে চক্ষু অবনমীত রাখার বিধান। আবার নারীর জন্য দিয়েছে আরেকটি অতিরিক্ত বিধান পর্দা। এগুলো প্রত্যেকের উপর ফরয। যিনি এর ব্যতিক্রম করবেন তিনি ফরয বিধান লঙ্গনের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তির অপরাধ যিনা বা ধর্ষণ পর্যায়ে উপনীত হয় তবে তার জন্য রয়েছে দুনিয়াবী শাস্তি; একশত বেত্রাঘাত বা হত্যা।

কিন্তু শরীয়ত এসব অপরাধের জন্য অন্যকে দায়ী করেনি। যেমন একজন নারী বস্ত্রহীন অবস্থায় ঘুরলে সে হারাম অপরাধ করছে এবং কবীরাহ গোনাহে লিপ্ত হচ্ছে। এর জন্য পরকালে শাস্তি থাকলেও কুরআনে কোনো দুনিয়াবী শাস্তির কথা বলা হয়নি। তবে নারী বস্ত্রহীন অবস্থায় বের হলে পুরুষ ধর্ষণের লাইসেন্স পেয়ে গেলো? এমন নয়। একজন নারী বস্ত্রহীন হয়ে বের হলে তার শাস্তি সে ভোগ করবে। কিন্তু বস্ত্রহীনতার কারণে নিজেকে নিয়ান্ত্রন করতে না পারার অজুহাতে ধর্ষণ করার কথা বললেও ধর্ষণের শাস্তি বিন্দুমাত্র লঘু হবে না। তাই ধর্ষণের জন্য নারীর পর্দাকে দায়ী করার কোনো অপশন এই মর্মে শরীয়তে নেই।

নারীকে পর্দার সাথে থাকার কথা বলে শরীয়ত হয়তো পুরুষের উপর দয়া করেছে। কারণ বেপর্দা নারী দেখলে পুরুষ হয়তো উত্তেজিত হয়ে ধর্ষণের মতো অপরাধে পা বাড়াতে পারে। কিন্তু পা বাড়িয়ে দিলে নারীর বেপর্দার কারণে পুরুষের অপরাধ যেমন লঘু হবে না, তেমনি তার শাস্তিও। কারণ নারী বেপর্দায় থাকলে ধর্ষণের পথে পা বাড়ানোর অনুমোদন পুরুষকে দেওয়া হয়নি। বরং নারী যতই বেপর্দা হবে, পুরুষের উপর আপন চক্ষু হেফাযাতের বিধান ততোই কঠোর হবে। নারী বেপর্দা ও বস্ত্রহীন হয়ে বের হওয়া যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি যেখানে গেলে বস্ত্রহীন নারী দেখা ছাড়া উপায় থাকবে না, সেখানে পুরুষের যাওয়াও নিষিদ্ধ।

মূলত ধর্ষণ নারীর পর্দা বেপর্দা থেকে সৃষ্টি হয় না। সৃষ্টি হয় পুরুষের হিংস্র পদস্খলিত প্রবৃত্তি থেকে। নতুবা কলেজ ভার্সিটির একই পরিবেশে লেখাপড়া করে সবাই কি ধর্ষক হয়? ধর্মের আলো পেয়ে চারিত্রিক গুণকে যারা মার্জিত করে নিয়েছে তাদেরকে একটি ধর্ষণের ঘটনায় পেয়েছেন? সহশিক্ষা, বেপর্দা ইত্যাদি যদিও ধর্ষণের দিকে কিছুটা ধাবিত করে, কিন্তু এগুলো মূল হলে কলেজ ভার্সিটির সব ছাত্র শিক্ষক ধর্ষক হওয়ার কথা ছিলো? আজকের এই নরপিশাচগুলো যে ভার্সিটি বা কলেজে পড়ে, এই ভার্সিটি বা কলেজে কি হাজার হাজার এমন ছাত্র নেই, যারা ধর্ষণের সাথে জড়িত নয়? অথচ একই পরিবেশে উভয়ের বসবাস।

মূলত চরিত্রিক গুণে মার্জিত ব্যক্তিকে নারীর বেপর্দা ধর্ষণের মতো অপরাধে ধাবিত করতে পারে না। অপরদিকে হিংস্র চরিত্রের নরপিশাচদের থেকে হাজারো পর্দা নারীকে রক্ষা করতে পারে না। এমনকি আপনার মা, মেয়ে বোনকে ঘরের কুঠিরে আবদ্ধ রাখলেও তারা নারীর গন্ধ শুঁকে আপনার ঘরে হানা দিবে। যার বাস্তবতা বর্তমানে দেখছেন। সৌদি আরব, ইরান, আফগানের নারী কি পর্দার কারণে ধর্ষণ মুক্ত বলে আপনি মনে করেন? মোটেও না। হিংস্র পশু থেকে জঙ্গলের নিরীহ প্রাণী যেমন গুহায় বা গুহার বাহিরে কোথাও নিরাপদ নয়, তেমনি মানবতাকে বিসর্জন দেওয়া মানুষ নামের পশুগুলো থেকে নারী কোথাও নিরাপদ নয়। বরং ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথে ধর্ষিতা নিজ হাতে গুলি করে ধর্ষককে হত্যা, ধর্ষককে জনসম্মুখে জবাই, ধর্ষককে প্রস্তরাঘাতে মৃতদন্ডই ঐসব দেশের নারীকে ধর্ষণ থেকে রক্ষা করেছে।

অতএব ধর্ষণের মূল প্রতিকার হলো নিজ প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রন আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে আসতে পারে, আবার কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আসতে পারে। তবে আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ আসা সবার বেলা নিশ্চিত নয়, কারণ এজন্যই চাই পরকালের শাস্তির পূর্ণ বিশ্বাস যা সবার মাঝে নেই। তাছাড়া পরকালে ক্ষমা পাওয়ার আশাও অনেককে বিরত রাখতে না পারে। আবার নগদ শাস্তিকে মানুষ যেমন ভয় পায়, বিলম্বিত শাস্তিকে ততোটা ভয় পায় না। তাই শরীয়তের বেশিরভাগ অপরাধের শাস্তি পরকালের সাথে জড়িত থাকলেও ধর্ষণের শাস্তি কেবল পরকালের সাথে রাখা হয়নি। বরং দুনিয়াতেই কঠিন শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে; যাতে একজন নারী মানুষ নামের পশু থেকে সংরক্ষিত থাকে।

অতএব ধর্ষণের একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তির দ্রুত প্রয়োগ। ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার সাথে জনসম্মুখে মৃত্যুদন্ড (যেভাবেই হোক) কিংবা যাবজ্জীবনের কন্ডম সেলই পারে ধর্ষণ নিয়ন্ত্রন করতে। জেলে গিয়ে বুক ফুলিয়ে চলতে পারা কারাদন্ড মানুষকে এ থেকে বিরত রাখতে পারবে না। হয়তো দ্রুত মৃতদন্ড নিশ্চিত করুন, নতুবা কন্ডম সেলে যাবজ্জীবন রাখুন, নতুবা পশুত্বকে হার মানানো এই পিশাচদের জন্য পশুদের মতো চিড়িয়াখানা বানিয়ে সেই চিড়িয়াখানায় একেকে পশুকে একে লৌহপিঞ্জিরায় রাখুন।

ধর্ষণের প্রতিকারের জন্য যে শাস্তিগুলোর কথা বললাম তা কুরআন ও গণতান্ত্রিক উভয় আইনেই সিদ্ধ। কুরআনে তাদের চার শাস্তির মাঝে একটি হলো মৃত্যুদন্ড বা পৃথিবীতে বিচরণ থেকে বারণ, যা কন্ডম সেল বা চিড়িয়াখানার মাধ্যমে হতে পারে। আর গণতন্ত্রের কথা বললে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব জানোয়ারের বেলায় এমন শাস্তি চায়। মূলত কুরআনী আইনের কথা বললে, অনেকের চুলকালেও আল্লাহর আইন একটি স্বভাবজাত ধর্ম, যা সুস্থ মস্তিস্তেকের সবাই পছন্দ করতে বাধ্য। অতএব ইসলামী আইনের কথা বললে অনেকে দেশ ইসলামী না হওয়ার অজুহাত তুলতে পারেন। তাই আমি বলবো, ধর্ষণের একমাত্র প্রতিকার দ্রুত বিচার ও কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তির প্রয়োগ না করে অন্য পথে দৌড়ালে আপনারা কখনো ধর্ষণ থামাতে পারবেন না এবং রক্ষা করতে পারবেন না আমার মা বোনকে।

তাই প্রশাসনের সবার কাছে এই রিকুয়েস্ট করবো, আপনারা যদি আপনার বাসায় গিয়ে দেখতেন ধর্ষক আপনার মা, মেয়ে, বিবি, বোনের সাথে এমন আচরণ করছে, তখন আপনারা কী করতেন? যে নারীর সাথে এমন আচরণ হয়েছে সেও কারো মা, বিবি, মেয়ে, বোন। আপনারা কি কেবল আপনার মা মেয়েকে নরপিশাচদের থেকে রক্ষার জন্য নিয়োজিত, নাকি পুরো নারীজাতির জন্য আপনারা রক্ষক? তাই আর অপেক্ষা নয়, আমাদের বুক ফাটা অর্তনাদ শুনে আপনাদের কলিজা নাড়া দিক সেটাই কামনা করি।

Last Updated on

শেয়ার করুন
  •  
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





Sylheter#Barta@777

©সিলেটের বার্তা ২৪ কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।