বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০১:২৯ পূর্বাহ্ন২১শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

নোটিশঃ
★করোনাভাইরাস থেকে হেফাজত থাকতে পড়ুন-'লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনায যোয়ালিমীন'।। ★সিলেটের বার্তায় প্রতিনিধি/সংবাদদাতা নিয়োগ চলছে। তাই যোগাযোগ করুন নিম্নের মেইল অথবা নাম্বারে।
বনের পশু নয় হোক মনের পশুর কুরবানী

বনের পশু নয় হোক মনের পশুর কুরবানী

প্র্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের আগে লাক্কাতুরা পশুর হাটের ছবি।

সিলেটের বার্তা ডেস্ক::১ আগস্ট শনিবার সারা দেশের ন্যায় সিলেটেও উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আযহা।

মুসলিম উম্মাহর জন্য এই প্রধান উৎসবে পশু জবাই করা হয়ে থাকে। হযরত ইব্রাহিম আলাহিস সালাম এর ত্যাগে উজ্জীবিত হওয়ার দিন এটি।

পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সিলেটের বার্তা টুয়েন্টি ফোর ডটকম এর অসংখ্য পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ সকলকে আমাদের পক্ষ থেকে জানাই ঈদ মোবারক।

আমাদের পাঠক/পাঠিকাদের সুবিধার্থে কুরবানী সংক্রান্ত জরুরী মাসআলা-মাসাঈল উল্লেখ করছি।

কোরবানি মহান পালনকর্তার তরফ থেকে বান্দার জন্য একটি স্পেশাল নেয়ামত। নবী হযরত ইবরাহিম খলিলুল্লাহ আ.’র ত্যাগের মহিমা মাখা উজ্জল নিদর্শন। প্রভুর হুকুম তামিলে প্রিয়পাত্র হিসেবে নিজপুত্র হযরত ইসমাঈল আ.’র গলায় ছুড়ি চালিয়ে বিশ্ববাসিকে তাক লাগিয়ে প্রভু প্রেমের অভুতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় পুত্র ইসমাঈল যাবিহুল্লাহ খেতাবে ভুষিত হলেন। তারই ধারাবাহিকতায় মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর দশ যিলহাজ্ব তারিখে প্রভুর নৈকট্য লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকেন।

কোরবানির দিনের ফযিলত ঃ (১) এ দিনের একটি নাম হল ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজ্বের দিন। যে দিনে হাজ্বীগণ তাদের পশু জবেহ করে হজ্বকে পূর্ণ করেন। হাদিসে এসেছে ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল−াহ সা. কোরবানির দিন জিজ্ঞেস করলেন এটা কোন দিন? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন এটা ইয়াওমুন নাহার বা কোরবানির দিন। রাসূলে কারীম সা. বললেন, এটা ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজ্বের দিন। (২) কোরবানির দিনটি হল বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে এসেছে আব্দুল−াহ ইবনে রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন, আল−াহর নিকট দিবস সমূহের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হল কোরবানির দিন, তারপর পরবর্তী তিনদিন। (৩) কোরবানির দিনটি হল ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন। কেননা এ দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনে সালাত ও কোরবানি একত্র হয়। যা ঈদুল ফিতরের সালাত ও সদকাতুল ফিতরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল−াহ তাআলা তার রাসূলকে কাওসার দান করেছেন। এর শুকরিয়া আদায়ে তিনি তাকে এ দিনে কোরবানি ও সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

কোরবানির দিনে করণীয় ঃ ঈদের সালাত আদায় করা, এর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা অর্জন, সুন্দর পোশাক পরিধান করা। তাকবীর পাঠ করা। কোরবানির পশু যবেহ করা ও তার গোশত আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা। এ সকল কাজের মাধ্যমে আল−াহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন ও সš‘ষ্টি অন্বেষণের চেষ্টা করা। এ দিনটাকে শুধু খেলা-ধুলা, বিনোদন ও পাপাচারের দিনে পরিণত করা কোন ভাবেই ঠিক নয়। কোরবানি পশু উৎসর্গ করা হবে এক আল−াহর এবাদতের উদ্দেশ্যে যার কোন শরিক নেই। আল−াহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার এবাদত করার জন্য। যেমন তিনি বলেন:‘আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে তারা শুধু আমার এবাদত করবে।’ আল−াহ তাআলা তার এবাদতের জন্য মানব জাতিকে সৃষ্টি করলেন। এবাদত বলে যে সকল কথা ও কাজ আল−াহ রাব্বুল আলামিন ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন; হোক সে কাজ প্রকাশ্যে বা গোপনে।৫ আর এ এবাদতের একটি গুর“ত্বপূর্ণ বিষয় হল তার উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা। এ কাজটি তিনি শুধু তার উদ্দেশ্যে করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন ‘বল, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল−াহরই উদ্দেশ্যে। তার কোন শরিক নাই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ ইবনে কাসীর রহ. বলেন : এ আয়াতে আল−াহ রাব্বুল আলামিন নির্দেশ দিয়েছেন যে সকল মুশরিক আল−াহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তাদের যেন জানিয়ে দেয়া হয় আমরা তাদের বিরোধী। সালাত, কোরবানি শুধু তার নামেই হবে যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল−াহ তাআলা সূরা কাওসারে বলেছেন ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর।’ অর্থাৎ তোমার সালাত ও কোরবানি তারই জন্য আদায় কর। কেননা মুশরিকরা প্রতিমার উদ্দেশে প্রার্থনাকরে ও পশু জবেহ করে। আর সকল কাজে এখলাস অবলম্বন করতে হবে। এখলাসের আদর্শে অবিচল

থাকতে হবে। যে আল−াহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু উৎসর্গ বা জবেহ করবে তার ব্যাপারে কঠোর শাস্তির কথা। হাদিসে এসেছে আবু তোফায়েল থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আমি আলী ইবনে আবি তালেবের কাছে উপ¯ি’ত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল ‘নবী কারীম স. গোপনে আপনাকে কি বলেছিলেন ?’ বর্ণনাকারী বলেন : আলী রা. এ কথা শুনে রেগে গেলেন এবং বললেন : ‘নবী কারীম স. মানুষের কাছে গোপন রেখে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল: ‘হে আমিরুল মোমিনীন! সে চারটি কথা কি ? তিনি বললেন, ১. যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে অভিশাপ দেয় আল−াহ তাকে অভিশাপ দেন। ২. যে ব্যক্তি আল−াহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবেহ করে আল−াহ তার উপর লা’নত করেন। ৩. ঐ ব্যক্তির উপর আল−াহ লা’নত করেন যে ব্যক্তি কোন বেদআতীকে প্রশ্রয় দেয়। ৪. যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে আল−াহ তাকে লা’নত করেন। এ কাজগুলো এমন, যে ব্যক্তি তা করল সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কুফরির সীমানায় প্রবেশ করল। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নবভী রহ. বলেন, আল−াহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু জবেহ করার অর্থ এমন, যেমন কোন ব্যক্তি প্রতিমার নামে জবেহ করল অথবা কোন নবীর নামে জবেহ করল বা কাবার নামে জবেহ করল। এ ধরনের যত জবেহ হবে সব না-জায়েজ ও তা খাওয়া হারাম। জবেহকারী মুসলিম হোক বা অমুসলিম। যা আল−াহ ব্যতীত অন্যের নামে জবেহ করা হয় তা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে: ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জš‘, রক্ত, শুকর মাংস, আল−াহ ব্যতীত অপরের নামে জবেহকৃত পশু আর শ্বাস রোধে মৃত জš‘, শৃংগাঘাতে মৃত জš‘ এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জš‘ ; তবে যা তোমরা জবেহ করতে পেরেছ তা ব্যতীত, আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এ সব হল পাপ-কার্য…। ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন যা কিছু আল−াহ ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয় তা যে হারাম এ ব্যাপারে মুসলিমদের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি আল−াহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু জবেহ করে সে জাহানড়বামে যাবে। যেমন হাদিসে এসেছে:সালমান রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:এক ব্যক্তি জানড়বাতে প্রবেশ করবে একটি মাছির কারণে। অন্য এক ব্যক্তি জাহানড়বামে প্রবেশ করবে একটি মাছির কারণে। এ কথা শুনার পর লোকেরা জিজ্ঞেস করল এটা কীভাবে হবে ? তিন বললেন : দু ব্যক্তি এক সম্প্রদায়ের কাছ দিয়ে যা”িছল। সে সম্প্রদায়ের নিয়ম হল যে ব্যক্তি তাদের কাছ দিয়ে যাবে তাকে তাদের প্রতিমার উদ্দেশ্যে কিছু উৎসর্গ করতে হবে। সে সম্প্রদায়ের লোকেরা এ দুজনের একজনকে বলল : আমাদের এ প্রতিমার জন্য কিছু উৎসর্গ কর ! লোকটি উত্তর দিল আমার কাছে তো এমন কিছু নেই যা আমি এ প্রতিমার জন্য উৎসর্গ করতে পারি। তারা বলল একটি মাছি হলেও উৎসর্গ কর। সে একটি মাছি উৎসর্গ করল। তারা তাকে ছেড়ে দিল। ফলে সে জাহানড়বামে যাবে। তারপর তারা দ্বিতীয় ব্যক্তিকে অনুরূপ কথা বলল। সে উত্তরে বলল আমি আল−াহ ছাড়া অন্য কারো জন্য কিছু উৎসর্গ করি না। তারা তাকে হত্যা করল। ফলে সে জানড়বাতে প্রবেশ করল। বর্ণিত এ হাদিস থেকে আমরা কয়েকটি শিক্ষা লাভ করতে পারি ঃ (১) শিরক কত বড় মারাত্মক অপরাধ তা অনুধাবন করা যায়। যদি তা খুব সামান্য বিষয়েও হয়। যেমন আল−াহ তাআলা বলেছেন:‘যে আল−াহর সাথে শরিক করবে আল−াহ তার জন্য জানড়বাত অবশ্যই নিষিদ্ধ করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।’ (২) যে লোকটি জাহানড়বামে গেল সে কিš‘ উক্ত কাজ করতে ই”ছুক ছিল না। কিš‘ সে মুশরিকদের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য কাজটি করেছিল। (৩) যে লোকটি জাহানড়বামে গেল সে মুসলিম ছিল, কিš‘ সামান্য বিষয়ে শিরক করার কারণে জাহানড়বামে

গেল। (৪) তাওহীদ ও এখলাসের ফজিলত কত বেশি তা অনুধাবন করা যায়।

(৫) যে লোকটি জানড়বাতে প্রবেশ করল সে তাওহীদের জন্য নির্যাতন সহ্য করল, নিহত হল তবু শিরকের সাথে আপোশ করল না।

কোরবানির অর্থ ও তার প্রচলন ঃ কোরবানি বলা হয় আল−াহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন ও তার এবাদতের জন্য পশু জবেহ করা। আর আল−াহর উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা তিন প্রকার হতে পারে ঃ১. হাদী ২. কোরবানি ৩. আকীকাহ। তাই কোরবানি বলা হয় ঈদুল আযহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট প্রকারের গৃহপালিত পশু আল−াহর নৈকট্য অর্জনের জন্য যবেহ করা। ইসলামি শরিয়তে এটি এবাদত হিসেবে সিদ্ধ, যা কোরআন, হাদিস ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত দ্বারা প্রমাণিত। কোরআন মজীদে যেমন এসেছে ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর।’ (সুরা কাউসার) ‘বল, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল−াহরই উদ্দেশ্যে। তার কোন শরিক নাই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ হাদিসে এসেছে:বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল−াহ স. বলেছেন : যে ঈদের সালাতের পর কোরবানির পশু জবেহ করল তার কোরবানি পরিপূর্ণ হল ও সে মুসলিমদের আদর্শ সঠিকভাবে পালন করল। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আল−াহর রাসূল স. নিজ হাতে দুটি সাদা কালো বর্ণের দুম্বা কোরবানি করেছেন। তিনি বিসমিল−াহ ও আল−াহু আকবর বলেছেন। তিনি পা দিয়ে দুটো কাঁধের পাশ চেপে রাখেন। তবে বোখারিতে ‘সাদা-কালো’ শব্দের পূর্বে ‘শিংওয়ালা’ কথাটি উলে−খ আছে কোরবানির বিধান

কোরবানির হুকুম ঃ এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে দুটো মত রয়েছে। প্রথমত : কোরবানি ওয়াজিব। ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানীফা রাহ. প্রমুখের মত এটাই। আর ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ রহ. থেকে একটি মত বর্ণিত আছে যে তারাও ওয়াজিব বলেছেন। দ্বিতীয় মতঃ কোরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এটা অধিকাংশ উলামাদের মত। এবং ইমাম মালেক ও শাফেয়ী রাহ.’র প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেন, সামর্থ্য থাকা অব¯’ায় কোরবানি পরিত্যাগ করা মাকরূহ। যদি কোন জনপদের লোকেরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে কোরবানি পরিত্যাগ করে তবে তাদের বির“দ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কেননা, কোরবানি হল ইসলামের একটি শিয়ার বা মহান

নিদর্শন।

যারা কোরবানি ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল ঃ (এক) আল−াহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন : ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর।’(সুরা কাউসার) আর আল−াহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব হয়ে থাকে। (দুই) রাসূলে কারীম স. বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে।’ যারা কোরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্ক-বাণী। তাই কোরবানি ওয়াজিব। (তিন) রাসূলে কারীম স. বলেছেন : হে মানব সকল ! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হল প্রতি বছর কোরবানি দেয়া। যারা যারা কোরবানি সুন্নত বলেন তাদের দলিল ঃ (এক) রাসূলুল−াহ স. বলেছেন : ‘তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করতে চায়, যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কোরবানি সম্পনড়ব

করার আগে তার কোন চুল ও নখ না কাটে।’ এ হাদিসে রাসূল স.-এর ‘যে কোরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়। (দুই) রাসূল স. তার উম্মতের মাঝে যারা কোরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কোরবানি ওয়াজিব নয়। শাইখ ইবনে উসাইমীন রহ. উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ উলে−খ করার পর বলেন: এ সকল দলিল-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয় বরং একটা অন্যটার সম্পূরক।

সারকথা হল যারা কোরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী। আর ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মত এটাই।

কোরবানির ফজিলত ঃ (ক) কোরবানি দাতা নবী ইবরাহিম আ. ও মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।

(খ) পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানি দাতা আল−াহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল−াহ তাআলা বলেন, ‘আল−াহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল−াহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন ; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে।’ (গ) পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দান। আর এটা অন্য এক ধরনের আনন্দ যা কোরবানির গোশতের পরিমাণ টাকা যদি আপনি তাদের সদকা দিতেন তাতে অর্জিত হত না। কোরবানি না করে তার পরিমাণ টাকা সদকা করে দিলে কোরবানি আদায় হবে না।

কোরবানির শর্তাবলি ঃ (১) এমন পশু দ্বারা কোরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল উট, গর“, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এ গুলোকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আনআম।’ যেমন এরশাদ হয়েছে : ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি ; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জš‘ দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল−াহর নাম উ”চারণ করে।’ হাদিসে এসেছে ‘তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কোরবানি করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কোরবানি করতে পার।’ আর আল−াহর রাসূল সা. উট, গর“, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া অন্য কোন জš‘ কোরবানি করেননি ও কোরবানি করতে বলেননি। তাই কোরবানি শুধু এগুলো দিয়েই করতে হবে। ইমাম মালিক রহ.-এর মতে কোরবানির জন্য সর্বোত্তম জš‘ হল শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ রাসূলে কারীম সা. এ ধরনের দুম্বা কোরবানি করেছেন বলে বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে। উট ও গর“-মহিষে সাত ভাগে কোরবানি দেয়া যায়। যেমন হাদিসে এসেছে— ‘আমরা হুদাইবিয়াতে রাসূলুল−াহ স.-এর সাথে ছিলাম। তখন আমরা উট ও গর“ দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে কোরবানি দিয়েছি।’ গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হল কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পনড়ব, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া। (২) শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জর“রি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গর“ বা মহিষ দু বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের। (৩) কোরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্র“টি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে : সাহাবি আল-বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল−াহ স. আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেন : চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে না—অন্ধ ; যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাμান্ত ; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু ; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত ; যার কোন অংগ ভেংগে গেছে। নাসায়ির বর্ণনায় ‘আহত’ শব্দের স্থলে ‘পাগল’ উলে−খ আছে। আবার পশুর এমন কতগুলো ত্র“টি আছে যা থাকলে কোরবানি আদায় হয় কিš‘ মাকরূহ হবে। এ সকল দোষত্র“টিযুক্ত পশু কোরবানি না করা ভাল। সে ত্র“টিগুলো হল শিং ভাংগা, কান কাটা, লেজ কাটা, ওলান কাটা, লিংগ কাটা ইত্যাদি। (৪) যে পশুটি কোরবানি করা হবে তার উপর কোরবানি দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত্ব থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কোরবানি আদায় হবে না।

কোরবানির নিয়মাবলি ঃ কোরবানির পশু কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা কোরবানির জন্য পশু পূর্বেই নির্ধারণ করতে হবে। এর জন্য নিুোক্ত দুটো পদ্ধতির একটি নেয়া যেতে পারে। (ক) মুখের উ”চারণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। এভাবে বলা যায় যে ‘এ পশুটি আমার কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা হল।’ তবে ভবিষ্যৎ বাচক শব্দ দ্বারা নির্দিষ্ট হবে না। যেমন বলা হল—‘আমি এ পশুটি কোরবানির জন্য রেখে দেব।’ (খ) কাজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা যায় যেমন কোরবানির নিয়তে পশু μয় করল অথবা কোরবানির নিয়তে জবেহ করল। যখন পশু কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা হল তখন নিুোক্ত বিষয়াবলী কার্যকর হয়ে যাবে। প্রথমতঃ এ পশু কোরবানি ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না, দান করা যাবে না, বিμি করা যাবে না। তবে কোরবানি ভালভাবে আদায় করার জন্য তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে। দ্বিতীয়ত : যদি পশুর মালিক ইন্তেকাল করেন তাহলে তার ওয়ারিশদের দায়িত্ব হল এ কোরবানি বাস্তবায়ন করা।

তৃতীয়ত : এ পশুর থেকে কোন ধরনের উপকার ভোগ করা যাবে না। যেমন দুধ বিμি করতে পারবে না, কৃষিকাজে ব্যবহার করতে পারবে না, সওয়ারি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, পশম বিμি করা যাবে না। যদি পশম আলাদা করে তাবে তা সদকা করে দিতে হবে, বা নিজের কোন কাজে ব্যবহার করতে পারবে, বিμি করে নয়। চতুর্থতঃ কোরবানি দাতার অবহেলা বা অযতেড়বর কারণে যদি পশুটি দোষযুক্ত হয়ে পড়ে বা চুরি হয়ে যায় অথবা হারিয়ে যায় তাহলে তার কর্তব্য হবে অনুরূপ বা তার চেয়ে ভাল একটি পশু μয় করা। আর যদি অবহেলা বা অযতেড়বর কারণে দোষযুক্ত না হয়ে অন্য কারণে হয়, তাহলে দোষযুক্ত পশু কোরবানি করলে চলবে। যদি পশুটি হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে যায় আর কোরবানি দাতার উপর পূর্ব থেকেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে সে কোরবানির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করবে। আর যদি পূর্ব থেকে ওয়াজিব ছিল না কিš‘ সে কোরবানির নিয়তে পশু কিনে ফেলেছে তাহলে চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা হারিয়ে গেলে তাকে আবার পশু কিনে কোরবানি করতে হবে।

কোরবানির ওয়াক্ত বা সময় ঃ কোরবানি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি এবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কোরবানি আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। অবশ্য কাজা হিসেবে আদায় করলে অন্য কথা। যারা ঈদের সালাত আদায় করবেন তাদের জন্য কোরবানির সময় শুর“ হবে ঈদের সালাত আদায় করার পর থেকে। যদি ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে কোরবানির পশু জবেহ করা হয় তাহলে কোরবানি আদায় হবে না। যেমন হাদিসে এসেছে বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বণির্ত তিনি বলেন, আমি শুনেছি রাসূলুল−াহ সা. খুতবায় বলেছেন, এ দিনটি আমরা শুরু করব সালাত দিয়ে। অত:পর সালাত থেকে ফিরে আমরা কোরবানি করব। যে এমন আমল করবে সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করল। আর যে এর পূর্বে জবেহ করল সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করল। কোরবানির কিছু আদায় হল না। সালাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরবানি পশু জবেহ না করে সালাতের খুতবা দুটি শেষ হওয়ার পর জবেহ করা ভাল। কেননা রাসূলুল−াহ সা. এ রকম করেছেন। হাদিসে এসেছে জুনদাব ইবনে সুফিয়ান আল-বাজালী রা. বলেছেন, নবী কারীম সা. কোরবানির দিন সালাত আদায় করলেন অত:পর খুতবা দিলেন তারপর পশু জবেহ করলেন। জুনদাব ইবনে সুফিয়ান বলেন, আমি কোরবানির দিন নবী কারীম সা.’র সাথে ছিলাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নামাজের পূর্বে জবেহ করেছে সে যেন আবার অন্য স্থানে যবেহ করে। আর যে জবেহ করেনি সে যেন যবেহ করে। আর কোরবানির সময় শেষ হবে যিলহজ মাসের তেরো তারিখের সূর্যা¯ের সাথে সাথে। অতএব কোরবানির পশু জবেহ করার সময় হল চার দিন। যিলহজ মাসের দশ, এগারো, বার ও তেরো তারিখ। এটাই উলামায়ে কেরামের নিকট সর্বোত্তম মত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। কারণ, এক. আল−াহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল−াহর নাম উচ্চারণ করতে পারে।’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বোখারি রাহ. বলেন, ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, ‘এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে বুঝায় কোরবানির দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’ অতএব এ দিনগুলো আল−াহ তাআলা কোরবানির পশু জবেহ করার জন্য নির্ধারণ করেছেন। দুই. রাসূলুল−াহ সা. বলেছেন, ‘আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন জবেহ করা যায়।’ আইয়ামে তাশরীক বলতে কোরবানির পরবর্তী তিন দিনকে বুঝায়। তিন. কোরবানির পরবর্তী তিন দিনে সওম পালন জায়েজ নয়। এ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে এ তিন দিনে কোরবানি করা যাবে। চার. রাসূলুল−াহ সা. বলেছেন : ‘আইয়ামে তাশরীক হল খাওয়া, পান করা ও আল−াহর জিকির করার দিন।’ এ দ্বারা বুঝে নিতে পারি যে, যে দিনগুলো আল−াহ খাওয়ার জন্য নির্ধারণ করেছেন সে দিনগুলোতে কোরবানির পশু জবেহ করা যেতে পারে। পাঁচ. সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়, কোরবানির পরবর্তী তিনদিন কোরবানির পশু জবেহ করা যায়। ইবনুল কায়্যুম রাহ. বলেন, আলী ইবনে আবি তালেব রা. বলেছেন, ‘কোরবানির দিন হল ঈদুল আজহার দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’ অধিকাংশ ইমাম ও আলেমদের এটাই মত। যারা বলেন, কোরবানির দিন হল মোট তিন দিন; যিলহজ মাসের দশ, এগারো ও বার তারিখ। এবং বার তারিখের পর জবেহ করলে কোরবানি হবে না, তাদের কথার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই ও মুসলিমদের ঐক্যমত (ইজমা) প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি ঃ মূলত কোরবানির প্রচলন জীবিত ব্যক্তিদের জন্য। যেমন আমরা দেখি রাসূলুল−াহ সা. ও তার সাহাবাগণ নিজেদের পক্ষে কোরবানি করেছেন। অনেকের ধারণা কোরবানি শুধু মৃত ব্যক্তিদের জন্য করা হবে। এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। তবে মৃত ব্যক্তিদের জন্য কোরবানি করা জায়েয ও একটি সওয়াবের কাজ। কোরবানি একটি সদকা। আর মৃত ব্যক্তির নামে যেমন সদকা করা যায় তেমনি তার নামে কোরবানিও দেয়া যায়।যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য সদকার বিষয়ে হাদিসে এসেছে— আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল−াহ সা.-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল—হে রাসূল ! আমার মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন। কোন অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয় তিনি কোন কথা বলতে পারলে অসিয়ত করে যেতেন। আমি যদি এখন তার পক্ষ থেকে সদকা করি তাতে কি তার সওয়াব হবে ? তিনি উত্তর দিলেন : হ্যাঁ। মৃত ব্যক্তির জন্য এ ধরনের সদকা ও কল্যাণমূলক কাজের যেমন যথেষ্ট প্রয়োজন ও তেমনি তাঁর জন্য উপকারী। এমনিভাবে একাধিক মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কোরবানি করা জায়েজ আছে। অবশ্য যদি কোন কারণে মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য পূর্ণ একটি কোরবানি করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় ব্যক্তি নিজেকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি করেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। ভাল কাজ নিজেকে দিয়ে শুর“ করতে হয় তারপর অন্যান্য জীবিত ও মৃত ব্যক্তির জন্য করা যেতে পারে। যেমন হাদিসে এসেছে আয়েশা রা. ও আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল−াহ সা. যখন কোরবানি দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটো দুম্বা ক্রয় করলেন। যা ছিল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিংওয়ালা, সাদা-কালো বর্ণের এবং খাসি। একটি তিনি তার ঐ সকল উম্মতের জন্য কোরবানি করলেন ; যারা আল−াহর একত্ববাদ ও তার রাসূলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে, অন্যটি তার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য কোরবানি করেছেন। মৃত ব্যক্তি যদি তার সম্পদ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করে যান তবে তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।

অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি করা ঃ যাকে ‘ভাগে কোরবানি দেয়া’ বলা হয়। ভেড়া, দুম্বা, ছাগল দ্বারা এক ব্যক্তি একটা কোরবানি করতে পারবেন। আর উট, গরু, মহিষ দ্বারা সাত জনের নামে সাতটি কোরবানি করা যাবে। ইতিপূর্বে জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। অংশীদারি ভিত্তিতে কোরবানি করার দুটি পদ্ধতি হতে পারে : (এক) সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার হওয়া। যেমন কয়েক জন মুসলিম মিলে একটি বকরি μয় করল। অত:পর একজনকে ঐ বকরির মালিক বানিয়ে দিল। বকরির মালিক বকরিটি কোরবানি করল। যে কজন মিলে বকরি খরিদ করেছিল সকলে সওয়াবের অংশীদার হল। (দুই) মালিকানার অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি। দু জন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি বকরি কিনে সকলেই মালিকানার অংশীদার হিসেবে কোরবানি করল। এ অব¯’ায় কোরবানি শুদ্ধ হবে না। অবশ্য উট, গর“ ও মহিষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি জায়েজ আছে। মনে রাখতে হবে কোরবানি হল একটি এবাদত ও আল−াহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের উপায়। তাই তা আদায় করতে হবে সময়, সংখ্যা ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে শরিয়ত অনুমোদিত নিয়মাবলি অনুসরণ করে। কোরবানির উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া নয়, শুধু মানুষের উপকার করা নয় বা শুধু সদকা (দান) নয়। কোরবানির উদ্দেশ্য হল আল−াহ রাব্বুল আলামিনের একটি মহান নিদর্শন তার রাসূলের নির্দেশিত পদ্ধতিতে আদায় করা। তাই, আমরা দেখলাম কীভাবে রাসূলুল−াহ সা. গোশতের বকরি ও কোরবানির বকরির মাঝে পার্থক্য নির্দেশ করলেন। তিনি বললেন যা সালাতের পূর্বে জবেহ হল তা বকরির গোশত আর যা সালাতের পরে জবেহ হল তা কোরবানির গোশত।কোরবানি দাতা যে সকল কাজ থেকে দূরে থাকবেন হাদিসে এসেছে উম্মে সালামাহ রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল−াহ স. বলেছেন, তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করার ইচ্ছে করে সে যেন যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। ইমাম মুসলিম রাহ. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। তার অন্য একটি বর্ণনায় আছে ‘সে যেন চুল ও চামড়া থেকে কোন কিছু স্পর্শ না করে। অন্য বর্ণনায় আছে ‘কোরবানির পশু জবেহ করার পূর্ব পর্যন্ত এ অব¯’ায় থাকবে।’ কোরবানি দাতা চুল ও নখ না কাটার নির্দেশে কি হিকমত রয়েছে এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম অনেক কথা বলেছেন। অনেকে বলেছেন, কোরবানি দাতা হজ করার জন্য যারা এহরাম অব¯’ায় রয়েছেন তাদের আমলে যেন শরিক হতে পারেন, তাদের সাথে একাত্মতা বজায় রাখতে পারেন। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন : ‘কোরবানি দাতা চুল ও নখ বড় করে তা যেন পশু কোরবানি করার সাথে সাথে নিজের কিছু অংশ আল−াহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোরবানি (ত্যাগ) করায় অভ্যস্ত হতে পারেন এজন্য এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ যদি কেউ যিলহজ মাসের প্রথম দিকে কোরবানি করার ই”ছা না করে বরং কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর কোরবানির নিয়ত করল সে কি করবে? সে নিয়ত করার পর থেকে কোরবানির পশু জবেহ পর্যন্ত চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে।

কোরবানির পশু জবেহ করার নিয়মাবলিঃ কোরবানি দাতা নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবেহ করবেন, যদি তিনি ভালভাবে জবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল−াহ সা. নিজে জবেহ করেছেন। আর জবেহ করা আল−াহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। ইমাম বোখারি রাহ. বলেছেন, ‘হযরত আবু মুসা আশআরী রা. নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কোরবানির পশু জবেহ করেন।’ তার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত হয় মেয়েরা কোরবানির পশু জবেহ করতে পারেন। তবে কোরবানি পশু জবেহ করার দায়িত্ব অন্যকে অর্পণ করা জায়েজ আছে। কেননা সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে রাসূলুল−াহ সা. তেষট্টিটি কোরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করে বাকিগুলো জবেহ করার দায়িত্ব আলী রা.কে অর্পণ করেছেন।

পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের সবাইকে লোক দেখানো ভাব পরিত্যাগ করে আত্মত্যাগ আর কুরবাত ইলাল্লাহ’র উদ্দ্যেশে কোরবানি করার তাওফিক দান করেন।

তথ্যসূত্রঃ ১. সুরা কাউসার,আয়াতঃ ২
২. সুরা আনআম আয়াতঃ ১৬২
৩. সেহাহ সিত্তাহ (হাদিস গ্রন্থ)
৪. মাসাঈলে কোরবানি
৫. ফাযাঈলে কোরবানি

Last Updated on

শেয়ার করুন
  •  
  • 67
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





Sylheter#Barta@777

সিলেটের বার্তা পরিবারঃ

এম. এ কাদির-বালাগঞ্জ প্রতিনিধি

লিটন পাঠান-মাধবপুর প্রতিনিধি

 

©সিলেটের বার্তা ২৪ কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।