শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন২রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

২রা জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

নোটিশঃ
★করোনাভাইরাস থেকে হেফাজত থাকতে পড়ুন-'লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনায যোয়ালিমীন'।। ★সিলেটের বার্তায় প্রতিনিধি/সংবাদদাতা নিয়োগ চলছে। তাই যোগাযোগ করুন নিম্নের মেইল অথবা নাম্বারে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মনীন্দ্রচন্দ্র রায় এর অবদান

মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মনীন্দ্রচন্দ্র রায় এর অবদান

মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মনীন্দ্রচন্দ্র রায়

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি:: মনীন্দ্রচন্দ্র রায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় অবস্থিত বাঁশতলা ৫নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার জেনারেল মীর শওকত আলী ও সাবসেক্টর কমান্ডার কর্নেল এ.এস. হেলালউদ্দিন এর নেতৃত্বে সেখানে কর্মরত ছিলেন। তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন এই তথ্য সুনামগঞ্জের গর্ব, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, লেখক, সুনামগঞ্জের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোকিতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু মহোদয়ের ২০১২ সালে প্রকাশিত “রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ ‘নামক বইয়ের ৪৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য দোয়ারাবাজার -টেংরাটিলা-আশাউরা-কান্দাগাঁও- লিয়াকতগঞ্জ ইত্যাদি গ্রাম নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু এর প্রকাশিত “রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ ” বইয়ে এই কমিটির আংশিক রুপ পাওয়া গেছে তা নিম্নরুপ : সভাপতি হিসেবে ছিলেন দোয়ারাবাজারের এ.কে. এম আসকির মিয়া,সহসভাপতি আহসান উল্লাহ (ভাঙ্গাপাড়া),সদস্য সিরাজ মিয়া (কুমিল্লার লোক),মদনমোহন নন্দী(আশাউরা), উমেদ আলী মোড়ল (সোনাচূড়া) , ডা: আব্দুল হামিদ (টেংরাটিলা)। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে হাজী সোনাহর মিয়া (পশ্চিম মাছিমপুর), হারিছ মিয়া তালুকদার (দিঘলবন্দ),মোমিন উদ্দিন (দোয়ারাবাজার), সোনা মিয়া (পূর্ব মাছিমপুর), আব্দুল ওয়াহিদ (পশ্চিম মাছিমপুর), মোঃ ফজলুল হক (টেংরাটিলা),আব্দুল হক(টেংরাটিলা), সিরাজ মিয়া (বোগলা), মন্নান ফকির (বোগলা), আলফাজ মিয়া (বাগানবাড়ি), রুস্তম আলী (সোনাচূড়া), রুপা মিয়া (গোজাউরা), হাজী দাইম উল্লাহ(গোজাউরা), গোপাল চক্রবর্ত্তী(দোয়ারাবাজার) প্রমুখ উল্কার গতিতে কাজে নেমেছিলেন। মনীন্দ্রচন্দ্র রায়ও তাদের সাথে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সভাপতির নেতৃত্বে এই কেন্দ্রীয় সংগ্রাম কমিটির সদস্যরা ও সংগঠকরা মিলে পুরো এলাকায় পাকিস্তানি দোসরদের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এই আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছিলেন। তাদেরকে সীমান্তের রেঙ্গুয়া বাজারে মনীন্দ্রচন্দ্র রায়ের পাশের বাসার দোয়ারাবাজারের গোপাল বাবুর ফার্মিসিতে চিকিৎসা দেয়া হত এবং অনেককেই আবার বাঁশতলা ৫নং সেক্টরে কৈকত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হত। এই অসুস্থ শরীর নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে থাকতেন। মনীন্দ্রচন্দ্র রায় ছিলেন তাদের মধ্যে একজন পরিশ্রমী সংগঠক। তিনি বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। খাবার সরবরাহ করা, তথ্য দেয়া, অন্যান্য সংগঠকদের সংগঠিত করা, কেউ অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সহ ইত্যাদি কাজ করতেন।

দোয়ারাবাজার উপজেলার দোয়ারার প্রধান বাজার থেকে মুক্তিযুদ্ধে তিনজন অংশগ্রহণকারী হলেন এ কে এম আছকির মিয়া, গোপাল চক্রবর্ত্তী ও মনীনচন্দ্র রায়। বাজারের আশেপাশে অংশগ্রহণকারী অনেক মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন। চেলা, রেঙ্গুয়া ও বাঁশতলা ছিল মনীন্দ্রচন্দ্র রায়দের মুক্তি সংগ্রামের এলাকা। তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা চষে বেড়িয়েছেন। তিনি পরিবার পরিজন ছেড়ে প্রিয় মাতৃভূমির জন্য নিজের পরিশ্রম ও মেধা বিলিয়ে দেন , মাঝে মাঝে অভুক্ত থাকতেন , নিজের খাবার মুক্তিযোদ্ধাদের বিলিয়ে দিতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাপড় সংগ্রহ করতেন (কারণ অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের দিনের পর দিন এক কাপড় পড়তে পড়তে ছিড়ে যেত) ও রেঙ্গুয়ার গোপাল চক্রবর্ত্তীর ফার্মিসি থেকে ঔষধ এনে ক্যাম্পে দিতেন। তিনি হাসিমুখে সব কাজ করতেন। কোনো বিরুক্তি বোধের চিহ্নও ছিল না। তারা শুধু জানতো বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যত বাধাই আসুক পাকিস্তানি হায়নাদের কাছ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে ও দেশকে স্বাধীন করতে হবে। তারা গোপাল বাবুর কাছে গিয়ে রেডিও থেকে চরমপত্র অনুষ্ঠান শুনতো এবং সারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর জানতো। গোপাল বাবুও মনীন্দ্রচন্দ্র রায়দের অনুপ্রেরণা দিতেন যাতে মন খারাপ না হয়। তারা যেন প্রচুর উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবেই তারা মিলে মিশে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।।

মনীন্দ্রচন্দ্র রায় ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন নিবেদিত প্রাণ। তিনি ২০০১ সালের ৮ই জুন পরলোকগমন করেন। দোয়ারাবাজারের কৃতি সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের মহান এই সংগঠককে জাতির চির দিন মনে রাখা উচিত বলে আমরা মনে করি। তাই এই মহান সংগঠককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি।

যারা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন এই স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য। আমরা প্রত্যাশা করি তিনি জাতির কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাবেন। মনীন্দ্রচন্দ্র রায়কে নিয়ে আমরা দোয়ারাবাজারবাসী গর্বিত। জয় বাংলা।

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি
লেখক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
  •  
  • 117
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





Sylheter#Barta@777

©এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব sylheterbarta24.com কর্তৃক সংরক্ষিত