মূল রিপোর্ট: সিলেটের মানচিত্র :
চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর থেকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ৬ থানায় ১০৩ টি মামলা দায়ের করা হয়। একইভাবে সিলেট জেলায় হয় আরো ৮৭ টি মামলা। এসব মামলার অনেক বাদী নিয়ে দেখা দেয় নানান প্রশ্ন। এসকল মামলায় হাতিয়ে নেয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। একদিকে মামলার বাদি; অপরদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এদুয়ের মাঝে পড়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক নিরীহ মানুষ। কোন কোন মামলায় বাদী নিজেই খুলে বসেছেন ব্যবসার হাট। আবার অনেক ক্ষেত্রে মামলার বাদীকে ফাঁদে ফেলে নেওয়া হয়েছে স্বাক্ষর। এ ধরনের একটি ঘটনায় বাদীকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে মামলা বাণিজ্য করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ওলামা লীগের এক নেতা।
জানা গেছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটে জুলাইযোদ্ধার সঙ্গে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। প্রতারক চক্র জুলাইযোদ্ধার স্বাক্ষর নিয়ে মোটা অংকের মামলা বাণিজ্য করে। সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের করা সেই মামলার ব্যাপারে কিছুই জানেন না আহত ওই জুলাই যোদ্ধা। অথচ তাকে বাদী বানিয়ে সেই মামলায় অনেক নিরীহ লোককে আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে এসএমপি পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ এসএমপিতে আছে বলে জানান গেছে। এদিকে, মামলার বাদী জুলাইযোদ্ধা মো. বায়জিদ আলম আসামিদের চিনেন না বলে ভুক্তভোগীদেরকে নিশ্চিত করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা (নং ২/ তাং: ০২/০৭/২০২৫ ) দায়ের করা হয়। ওই মামলার বাদি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার থানার দোহালিয়া রামনগর গ্রামের আকবর আলীর ছেলে মো. বায়জিদ আলম (১৯)। মামলায় তার বর্তমান ঠিকানা এসএমপির জালালাবাদ থানার সুরমা আবাসিক এলাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এ মামলার বাদী মো. বায়জিদ আলম মামলার নিরীহ আসামিদের চিনেন না। একটি মামলাবাজ প্রতারক চক্র তাকে প্রলোভনে ফাঁদে ফেলে মামলাটি করিয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি তহবিলের টাকা পাইয়ে দিতে চুক্তি করেছিল প্রতারকরা। কাগজে তার স্বাক্ষর নিয়ে পরে আর কোন যোগাযোগ রাখেনি। পরে তিনি জানতে পারেন, তাকে বাদী করে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতারক চক্রটির মূল হোতা মো. রমিজ উদ্দিন ওরফে রমিজ মোল্লা। তিনি আওয়ামী উলামা লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তাকে একাধিক সভামঞ্চে দেখা গেছে। বিভিন্ন কমিটিতেও তিনি পদ-পদবি ব্যবহার করেছেন। তিনি ওলামা লীগের আহবায়কও ছিলেন। রমিজ উদ্দিন সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগরের বহর ধনকান্দি গ্রামের মো. জমির উদ্দিনের ছেলে। তার সহযোগী ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলার মাতুরতল বাজারের দক্ষিণ প্রতাপপুর গ্রামের লুৎফুর রহমানের ছেলে মাহবুব হোসেন।
বায়জিদ আলম এ প্রতিবেদককে জানান, তার সঙ্গে রমিজ মোল্লা ও তিনজন লোক দেখা করেছিল। তারা তাকে বলেছিল, ‘তুমি চিকিৎসার জন্য এক কোটি টাকা পাবে। অর্ধেক টাকা আমরা নিবো, বাকি টাকা তোমাকে দিবো। তোমাকে টাকা পেতে হলে একটি চুক্তি করতে হবে।’ মো. বায়জিদ আলম সরল বিশ্বাসে সেই চুক্তি করেন। চুক্তির সময় তার কাছ থেকে প্রতারকরা কিছু কাগজে স্বাক্ষর নেয়। এরপর তারা আর দেখা করেনি। টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, এখন দায়ের করা মামলায় ভুক্তভোগীদের চাপে ঠিকমতো বাড়িতে থাকতে পারছেন না।
বায়জীদ আলমের চুক্তিপত্র থেকে রমিজ মোল্লার ঠিকানা সংগ্রহ করে তার সঙ্গে এ প্রতিবেদক একাধিকবার যোগযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে চুক্তি ও মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। এ চুক্তি আমার নয়।’ সিলেট জেলা বারের আইনজীবী এডভোকেট মুহিব উদ্দিন স্বীকার করে বলেন,‘বায়জীদ আলম ও তার পিতা আলী আকবরের সঙ্গে মো. রমিজ উদ্দিনের চুক্তিটির স্ট্যাম্পে তিনি শনাক্তকারী আইনজীবী ছিলেন। তারা উভয়ের মধ্যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে। স্ট্যাম্পটির কপি তার কাছে সংরক্ষিত আছে।’
মামলার বাদী মো. বায়জীদ আলম বলেন,‘আমি একজন জুলাইযোদ্ধা। আন্দোলনে আমি চোখের পাশে আঘাত পেয়েছিলাম। এখন কিছুটা ভালো আছি। আমি যখন অসুস্থ ছিলাম, তারা (রমিজ মোল্লা) আমাকে চিকিৎসার খরচ মানবাধিকার সংস্থা থেকে এনে দিবে বলে এ চুক্তি করেছিল। পরে শুনলাম, আমি সিলেট কোতোয়ালি থানার মামলার বাদী! আমি এসব নিরীহ লোকদের আসামি করিনি। নিরীহ যারা আমার কাছে আসছেন, আমি তাদের আইনি সেবা পেতে সাহায্য করেছি।’
বায়জীদ আলমের বাবা আলী আকবর বলেন,‘আমি খুবই গরীব খেটে খাওয়া একজন মানুষÑ কাজকর্ম করে খাই। ওই প্রতারক রমিজ মোল্লা আমার ছেলেকে চিকিৎসার টাকা দিবে বলে চুক্তি করেছে। কাগজে দস্তখত নিয়ে তারা চলে গেছে, আর কোনো যোগাযোগ নাই। এখন নিরীহ মানুষ আমার কাছে আসে, আমি খুবই লজ্জা পাই। আমি পুলিশকে বলবো, রমিজ মোল্লাকে আটক করে আমার ছেলের দস্তখতকৃত কাগজপত্র উদ্ধার করে দিতে।’
বায়েজিদের মামলার এক আসামী পেশায় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘বর্তমান পুলিশ কমিশনার খুবই ভালো মানুষ। এসএমপি ২৮ জন নির্দোষ মানুষকে রাজনৈতিক মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সে কারণে আমিও এ ব্যাপারে পুলিশ কমিশনারের কাছে দরখাস্ত করেছি। আশা করি, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি হওয়ার মামলা থেকে আমি অব্যাহতি পাবো।’
রমিজ মোল্লার ষড়যন্ত্রে আসামি হওয়া আরেকজন নিরীহ লোক বলেন,‘আমার সঙ্গে এক লন্ডনি প্রবাসীর জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। সেই লন্ডনি রমিজ মোল্লাকে দিয়ে আমাকে এই মামলার আসামি করেছে। অথচ আমি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী’।
এসএমপি জানায়, বেশ কিছু মামলায় কিছু নিরীহ লোককে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে বায়েজিদের মামলা অন্যতম। ওই মামলার আসামীদের অনেকেই অব্যাহতি পেতে পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। এরকম ভুক্তভোগী নিরীহ লোকদের মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে পুলিশ সিআরপিসি ১৭৩ ধারার নতুন ‘ক’ উপধারা অনুযায়ী তালিকা করতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে। এতে নিরীহ মানুষ হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছেন। এসব মামলা এসএমপির কমিশনার নিজে দেখভাল করছেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন,‘আমরা রাজনৈতিক কিছু মামলা থেকে নিরীহ লোকদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাদেরকে মামলার আসামি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।’
মূল রিপোর্ট: সিলেটের মানচিত্র :