আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে নানা ঘটনা কোথাও ছিনতাই, কোথাও মাদক, কোথাও প্রতারণা, কোথাও তরুণদের সংঘর্ষ, আবার কোথাও হতাশা থেকে আত্মহত্যার খবর। প্রতিটি ঘটনার পেছনে আলাদা বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি এসব সামাজিক সংকটের সঙ্গে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎহীনতার কোন সম্পর্ক আছে কি? অবশ্যই বেকারত্বকে সব অপরাধের কারণ বলা যাবে না। অপরাধের পেছনে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক পরিবেশ, মাদক, বৈষম্য, দুর্বল আইন প্রয়োগসহ নানা বিষয় কাজ করে। কিন্তু কর্মক্ষম একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন কাজ পান না, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন নিশ্চয়তা খুঁজে পান না, তখন তাঁর জীবনে হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করলে সমস্যার একটি অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের বেকারত্বের সংকট তাই কেবল অর্থনীতির হিসাব নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনেরও প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬৬ শতাংশ। কিন্তু যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮.০৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের ২০.৩ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে ছিলেন। অর্থাৎ, প্রতি পাঁচজন তরুণের প্রায় একজন এই তিনটি ক্ষেত্রের বাইরে। একই জরিপে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। (BBS, 2024; GED, 2025)। এই সংখ্যাগুলোকে শুধু পরিসংখ্যান ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি পরিবারের প্রত্যাশা এবং একটি সম্ভাবনাময় জীবনের গল্প।
প্রশ্ন হলো, তরুণেরা কাজ পাচ্ছেন না কেন?
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করেন, পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে শিক্ষার ব্যয় বহন করা হয়, আত্মীয়স্বজনের কাছে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে যখন তিনি দেখেন, চাকরির সুযোগ সীমিত, অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি পাওয়া কঠিন এবং উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণও ব্যয়বহুল, তখন তাঁর সামনে পথ সংকুচিত হয়ে আসে। এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রত্যেক বেকার তরুণকে শুধু অলস, অদক্ষ কিংবা উদ্যোগহীন বলে দায়ী করা কি ন্যায়সংগত? রাষ্ট্র যদি শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের সংযোগ তৈরি করতে না পারে, শিল্পায়ন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সবার কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে দায়ের প্রশ্নটি একতরফা হতে পারে না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থারও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা শিক্ষার্থীদের সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছি, কিন্তু বাস্তব কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত করছি? কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শিক্ষানবিশি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণকে কেন আরও কার্যকরভাবে মূলধারায় আনা যাচ্ছে না? শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কিংবা পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে উন্নয়নের সাফল্য ঘোষণা করলে কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বদলাবে না।
আরেকটি কঠিন প্রশ্ন: চাকরি সৃষ্টি করার দায়িত্ব কার?
সরকারের দায়িত্ব শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা নয়। এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাও সরকারের দায়িত্ব, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরিতে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি থাকতে হবে। যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তরুণদের মধ্যে এই ধারণা জন্মাতে পারে যে পরিশ্রমের চেয়ে পরিচয় ও প্রভাব বেশি কার্যকর। এই অবিশ্বাস রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে দুর্বল করে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের নামে যেকোন কাজকে সাফল্য হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও বন্ধ হওয়া উচিত। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে আয় অনিশ্চিত এবং সামাজিক সুরক্ষা সীমিত। একজন তরুণ কাজ করছেন, কিন্তু তাঁর আয় দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাপন সম্ভব হচ্ছে না এটিও অর্থনৈতিক নীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বেকারত্ব কমাতে এখন কী করা জরুরি?
প্রথমত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশি ও কর্মমুখী শিক্ষা বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন এবং স্থানীয় উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করতে হবে। ঋণ পাওয়া, ব্যবসা নিবন্ধন, করসংক্রান্ত নিয়ম বোঝা এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলাও জরুরি। মাদক প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে। অপরাধ ঘটার পর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে, কর্মসংস্থান কর্মসূচির সাফল্য শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব ফলাফলে মাপতে হবে। কতজন তরুণ স্থায়ী কাজ পেলেন, কতজনের আয় বাড়ল এবং কতজন প্রশিক্ষণ শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে নয়, জবাবদিহির মধ্য দিয়েই নীতির কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণেরা দেশের বোঝা নন; তাঁরা দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি। তাঁদের কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া নয়, জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ নষ্ট করা। আজ যে তরুণ কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না, কাল তাঁর হতাশা সমাজের বৃহত্তর সংকটের অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাই অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কর্মসংস্থানের ন্যায্য সুযোগ, শিক্ষার বাস্তবমুখী সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির জবাবদিহি।
যে রাষ্ট্র তরুণদের হাতে কাজের সুযোগ তুলে দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হারায় না; মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগও হারায়। বেকারত্ব কমানোর প্রশ্নটি তাই কেবল চাকরি দেওয়ার প্রশ্ন নয়, এটি তরুণদের মর্যাদা, সমাজের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।