শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মজুদদারদের উপার্জিত অর্থ হারাম, রয়েছে রাসূল সা. এর বদদোয়া
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মার্চ ২০২৪
খেজুর, চিনি, ছোলা, বেগুন, কাচা মরিচের দাম বেড়ে যায় রোজার আগে। গরম মসলা, সাতকড়ার মূল্যবৃদ্ধি পায় ঈদুল আযহার আগে। এভাবে টার্গেট করে মালামাল গোদামজাত করে বাড়ানো হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। বাজারে সংকট সৃষ্টি করে আশা একটাই মুনাফা অর্জন করা। আর এটাকেই মজুদদারি বলে।
মওজুদদারী একটি মারাত্মক অপরাধ, একে আরবি পরিভাষায় ‘এহতেকার’ বলা হয়। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সস্তা দামে খরিদ করে চড়া দামে বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে জমা করে রাখা মওজুদদারীর অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামের দৃষ্টিতে এটা একটি নিন্দনীয় কাজ।
ইসলাম এর ঘোর বিরোধিতা করে। এই অবৈধ, গর্হিত কার্যকলাপ সম্পর্কে মহানবী রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেছেন, নবীয়ে করিম রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; ‘যে ব্যক্তি মওজুদদারী করে সে পাপী।’
ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা মানবতার উপকার সাধন করে থাকে এবং লোকদের দু:খ-কষ্ট মোচন করে সুখ-শান্তি আনে, এটাই ইসলামের প্রধান উদ্দেশ্য। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ইসলাম তাকে কিছুতেই ক্ষমা করে না।
ইসলাম কঠোর ভাষায় মজুদদারীর বিরোধিতা করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চড়া দামে বিক্রয়ের জন্য ঘরে রাখা মহাপাপ। এই মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের জীবনে নানা দু:খ-কষ্ট এবং মানসিক ও দৈহিক বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে। তাই ইসলাম মজুদদারকে কাঠোর শাস্তি পাওয়ার উপযোগী বলে গণ্য করে।
বায়হাকী শরিফে হযরত মাআজ ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এতে মহানবী রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; ‘মজুদদার খুবই নিকৃষ্ট ব্যক্তি, আল্লাহ তায়ালা যদি (জিনিস পত্রের) দাম সস্তা করে দেন, তাহলে এই ব্যক্তি অনুতাপ, দু:খ প্রকাশ করে এবং যদি দাম বাড়িয়ে দেন তাহলে সে আনন্দিত হয়ে যায়।
যারা মজুদদরীতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের অন্তর থেকে খোদাভীতি চলে যায় এবং এটা হয় মানবতার প্রতি তাদের মারাত্মক অত্যাচার। আর যদি এরা কয়েক দিনও মজুদদারী করে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বিক্রয় বন্ধ করে দেয়, তাহলে মানুষের সংকটের অন্ত থাকে না। এর পরিবর্তে যতই দান-সদকা করা হোক না কেন তাতে কোন কাজ হবে না, জুলুম-অত্যাচারের ক্ষতি পূরণ হবে না। হাদীসগ্রন্থ রাজিনে হযরত আবু ওসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; ‘যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন যাবত খাদ্যদ্রব্য জমা করে রাখে, অত:পর তা দান করে দেয়, তাতে মজুদদারের পাপ মোচন হয় না।
যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাদ্য মওজুদ করে রাখে, সে একজন বড় অত্যাচারী, মহাপাপী। ইসলাম মানবতার ধর্ম এবং জনসাধারণের কল্যাণই এর প্রধান লক্ষ্য। যে ব্যক্তি মানবতার এই অনুপ্রেরণা থেকে বঞ্চিত, তার প্রতি আল্লাহর করুণা ও দয়া প্রদর্শিত হবে না। উল্লেখিত রাজিন গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত; তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খাদদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা করে রাখে এবং লোকদেরকে প্রদান না করে সে চড়া দামে সেগুলো বিক্রি করতে চায়, সে ব্যক্তি আল্লাহ হতে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহও তার মুখাপেক্ষী নন।’ অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি যখন বান্দার হক উপেক্ষা করে লোকদের অতিষ্ঠ করে তোলে, তার সাথে আল্লাহর আর কোন সম্পর্ক থাকে না। মানুষের সাথে যে ব্যক্তি সদাচরণ প্রদর্শন করে থাকে, আল্লাহর সম্পর্কও তার সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
অত্যাচারীর সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকে না। ইবনে মাজাহ শরিফে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজুদদারের জন্য বদদোয়া করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য বন্ধ রাখে, আল্লাহতায়ালা তাকে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ও অভাব-অনটনে পতিত করুন।’ অর্থাৎ তার ওপর আর্থিক ও শারীরিক বিপদাপদে লিপ্ত করুন এবং রোগ ও অভাবের শাস্তি দান করুন। যেভাবে আল্লাহর নিকট মজুদদার কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য, অনুরূপভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিভিন্ন শহরে ও বিভিন্ন দেশে পাচারকারীও আল্লাহর নিকট অতি নিন্দনীয়।
এ প্রসঙ্গে বোখারী ও ইবনে মাজাহ শরিফে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট হতে বর্ণনা করেছেন; ‘মাল পল্লী এলাকায় ও শহরে-বন্দরে প্রেরণকারীকে আল্লাহর অফুরন্ত ধনভা-ার হতে দান করা হয় এবং মজুদদারদের প্রতি অভিশাপ ও শাস্তি প্রদান করা হয়। এ সমস্ত হাদীস সামাজিক ধরণের, এগুলো সম্পূর্ণভাবে মানবতার সাথে জড়িত। যারা মজুদদারী কারবারে লিপ্ত, তারা মানবতার শত্রু। এদের দমনের জন্য কঠোরতর ব্যবস্থা অবলম্বন করা উচিত।
অবৈধ মোনাফা লোভীরা নিজেদের অজ্ঞতাবশত মনে করে থাকে যে, তারা অর্থ উপার্জনে অন্যান্যদের চাইতে অধিক চালাক কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে, অন্য কারণে তাদের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। মজুদদার আল্লাহর পক্ষ হতে শাস্তি ভোগ করে এবং তার উপার্জিত সমুদয় অর্থ অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষ বহু পাপ কাজ করে, কোন কোন পাপ কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
কোন কোন পাপের শাস্তি না দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ক্ষান্ত হন না এবং এই আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার পর মদীনাবাসীরা তাদের এই অভ্যাস পরিত্যাগ করে ঠিক ঠিক পরিমাপ করতে থাকে। ইবনে আবি হাতেমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত হেলাল ইবনে তাল্লেক একবার হজরত আবদল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন যে, মক্কা ও মদীনা বাসীরা উত্তম মাপ করে। ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন; এরূপ কেন করবে না যখন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বলেছেন; ‘মাপ-ওজনে কম-বেশি করে যারা, সর্বনাশ তাদের জন্য।’-সূরা মুতাফ্ফিফীন, আ/১
যারা জিনিসপত্রের পরিমাপে কম দিয়ে ব্যবসা করে, তাদের মুনাফালব্ধ অর্থ হারাম যা উপার্জনেরই অংশ বিশেষ এবং এই দুর্নীতির ফলে তাদের সমদ্র মুনাফাটাই দূষিত হয়ে যায়, যা আল্লাহর নিকট অপবিত্র এবং ঘৃণিত। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হুজুরে আকরাম রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; ‘মানুষের নিকট এমন এক যুগ আসবে যখন তারা হালাল-হারামের কোন তোয়াক্কা করবে না, যা হাতে আসবে তাই অর্জন করবে।’-বুখারী, মিশকাত হা/২৭৬১)
এই হারাম মাল ও হারাম উপার্জন সম্পর্কে হযরত আবু বকর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘যে দেহ হারাম দ্বারা প্রতিপালিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।-বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/২৭৮৭)।
প্রকাশক: মোঃ আব্দুর রহমানসম্পাদক: আতিকুর রহমান নগরী
উপদেষ্টা মণ্ডলী: মাওলানা জসিম উদ্দিন (ইউকে), রোটা. এএসএম আরিফ হোসেন, মোঃ নান্নু মিয়া
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সিলেটের বার্তা ২৪
মতামত