অবুঝ শিশুদের হাতে তাদের আব্বুর ছবি। পেছনে মায়েরদের হাতেও ছবি। চোখের জলে গড়িয়ে পুরো চেহারাটাই যেনো ভিজে গেছে। শিশুদের একটাই আকুতি 'ফিরিয়ে দেন আমাদের আব্বুকে'।
আজ শুক্রবার (২৮ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মায়েদের ডাকে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গুম দিবস।
আনিশা বলেন, ‘আমার ভাই তখন আরও ছোট ছিল। ও ঘুমাতে পারত না। আম্মু সারাদিন কান্নাকাটি করত। রাতে ভাই না ঘুমালে আম্মু বলত ঘুমিয়ে যাও। বাবা আসবে। দেখবা কলিং বেল বাজাচ্ছে।’
কান্নায় ভেঙে পড়ে আনিশা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বলেন, ‘আপনি একবার দেখেন। আমরা কেউ মিথ্যা বলিনি। আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দেন। আব্বু ছাড়া আমরা কীভাবে থাকব।’
আনিশার মত সাথিকা সরকার এসেছেন বাবাকে ফিরে পাওয়ার দাবি জানাতে। প্রথম শ্রেণিতে পড়া সাথিকার বাবা মো সোহেল ৮ বছর আগে গুম হয়েছেন। এখনো তার খোঁজ পাইনি তার পরিবার।
সাথিকা বলেন, ‘আমি তো জানিই না আব্বু কীভাবে হারিয়ে গেছে। আমি অনেক ছোট ছিলাম। আম্মু বলত আব্বু বিদেশ গেছেন। আমার জন্য অনেক খেলনা নিয়ে আসবেন। কিন্তু আব্বু এখনো খেলনা আনে নাই। কথাও বলিনি আব্বুর সঙ্গে। আম্মু কিছু আর বলে না।’
ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন গুম হওয়া সন্তানের খোঁজ চাওয়া মায়েরাও। তাদের আর্তনাদে হুট করেই যেন প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সন্তান হারানো বেদনা কীভাবে কাটাবেন বুঝতে পারেন না তারা।
গুমের শিকার সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা খাতুন বলেন, ‘মায়ের সন্তান ফিরে আসুক মায়ের কোলে। গুম হওয়া সব সন্তান তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন। আমাদের কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। শুধু চাই সন্তান ফিরে আসুক। সন্তান ফিরে আসবে এই আশায় পথ চেয়ে বসে আছি।’
‘গুম হওয়া’ মনির হোসেনের ভাই মো শহিদুল্লাহ বলেন, ‘২০১০ সালে আমার ভাইকে তুলে নেয়া হয়। ছয় মাস ধরে র্যাবের পেছনে ঘুরেছি। কোন খোঁজ দিতে পারে নাই। মামলা করতে চাইলে মামলা নেয়নি প্রথমে। পরে একটা মামলা করেও জানি না সেই মামলার কী অবস্থা। আমার ভায়ের কী অপরাধ? তাকে কি মেরে ফেলা হয়েছে? তাহলে অন্তত তার কবরটা আমাদেরকে দেখিয়ে দিক।’
লামিয়ার বাবা কাউসার হোসেন আট বছর আগে গুম হয়েছেন। লামিয়া তখন মায়ের সঙ্গে বরিশালে ছিল। ছোট লামিয়া তখন জানতো না গুম কী জিনিস। এখন একটু বুঝতে পারে বাবা নেই।
লামিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আব্বু অনেকদিন নেই। আম্মু কিছুই বলতে পারে না। শুধু কান্না করে। এখানে এসে দেখি আমার মত অনেকের আব্বু নেই। আব্বুকে আমি একটু দেখতে চাই।’
‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে গুমের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি গুম হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।’
তিনি জানান, দেশে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ১১ জন গুম হয়েছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ না পেয়ে অনিশ্চিত ও দুঃসহ জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের পরিবারের সদস্যদের। সরকার কখনও পদক্ষেপ নেয় না। কীভাবে দিন পার করবে পরিবারগুলো।
মতামত