শুধু ঘোষণায় বন্দী পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার
হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা, চোখজুড়ানো চা-বাগানের সবুজ, ঘন অরণ্য আর নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ-প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় আয়োজন দেশের অন্য জেলাগুলোতে খুব কমই আছে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় দৃশ্যপটও। বর্ষায় হাওর-নদীতে জলের উচ্ছ্বাস, শরতে সবুজের সমারোহ, শীতে কুয়াশার চাদর আর গ্রীষ্মে পাহাড়ি-অরণ্যের স্নিগ্ধতা-সব মিলিয়ে মৌলভীবাজার যেন সারা বছরই পর্যটনের জন্য প্রস্তুত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও সম্ভাবনার তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনও অনেক পিছিয়ে।প্রায় ২ হাজার ৭৯৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জেলা মৌলভীবাজারে দেশের সর্বোচ্চ ৯৩টি চা-বাগান থাকায় জেলাটি ‘চায়ের দেশ’, ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির বড় একটি অংশও এ জেলায়। হাকালুকি হাওরের ১৮১ বর্গকিলোমিটারের বেশি আয়তনের প্রায় ৭০ শতাংশ মৌলভীবাজারে এবং ৩০ শতাংশ সিলেট জেলায়। ফলে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনেরও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা।বর্ষায় ভারি বৃষ্টিতে জেলার নদীগুলো প্রাণ ফিরে পায়। মনু, ধলাই, কুশিয়ারা, ফানাই, জুড়ী ও সোনাইসহ নদীগুলো ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলার ১৫টি নদীর মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ৯টি। মনু নদীর মাতারকাপন বেরেজ বা সুইসগেট ইতোমধ্যে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেক অনন্য আকর্ষণ জলপ্রপাত। দেশের তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক জলপ্রপাতই মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথারিয়া পাহাড়ের মাধবকুণ্ড ও পরীকুণ্ড এবং কমলগঞ্জের রাজকান্দি পাহাড়ের হামহাম জলপ্রপাত। পাহাড়, বন আর ঝরনার সম্মিলিত সৌন্দর্য এসব স্থানকে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।তবে মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে বড় বিকাশ ঘটেছে শ্রীমঙ্গলকে ঘিরে। চা-বাগান, অরণ্য, লেক ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশের কারণে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। পর্যটকদের আবাসনের জন্য গড়ে উঠেছে উন্নতমানের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। চা গবেষণা কেন্দ্রের রেস্টহাউস, চা বোর্ডের চা জাদুঘর ও রিসোর্টের পাশাপাশি গ্র্যান্ড সুলতান অ্যান্ড টি রিসোর্ট এবং মৌলভীবাজারের দুসাই রিসোর্ট পর্যটকদের উন্নত সেবা দিচ্ছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্ট। এর মধ্যে দেড় শতাধিকই শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পাহাড়ি অরণ্যঘেরা এলাকায়।দর্শনীয় স্থানের সমারোহ:মৌলভীবাজারে পর্যটনের আকর্ষণের তালিকাও দীর্ঘ। কমলগঞ্জের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, ডানকান চা-বাগানের ক্যামেলিয়া লেইক, শমসেরনগর বিমানবন্দর, কুলাউড়ার নবাববাড়ি, শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রি ও কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের ঐতিহাসিক সিমেট্রি দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।এ ছাড়া কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্ট, শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চা-বাগানের চা-কন্যার ভাস্কর্য, চা জাদুঘর, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, হাইল হাওর, বাইক্কাবিল ও বিলাশছড়া লেকও রয়েছে পর্যটন তালিকায়।কমলগঞ্জের মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মণিপুরী পল্লী ও মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি, খাসিয়া পুঞ্জি, গারো পল্লি, বড়লেখার মাধবকুণ্ড ও পরীকুণ্ড, রাজনগরের কাউয়াদিঘী হাওর, কাশিমপুর পাম্প হাউস, কমলা রানীর দিঘি, জলের গ্রাম অন্তেহরি, মৌলভীবাজার সদরের বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, মনু ব্যারেজ, রাঙাউটি রিসোর্ট, বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ, কুলাউড়ার আমানীপুর ইকোপার্ক এবং বড়লেখার আগর-আতর শিল্পও পর্যটনের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে।ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাও কম নয়। রয়েছে সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর মাজার, মোগল আমলের খোজার মসজিদ এবং শ্রীমঙ্গলের মসজিদুল আউলিয়া খাজা মোজাম্মেল হক (রহ.)। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা মন্দির, তারাপাশার বিষ্ণুপদ ধাম ও কুলাউড়ার কাদিপুরের শিববাড়ি উল্লেখযোগ্য। দেশের মধ্যে একমাত্র পাঁচগাঁও দুর্গা মন্দিরে লাল বর্ণের দুর্গা প্রতিমায় পূজা হয়।পর্যটন বাড়ায় বাড়ছে ব্যবসার সুযোগ:পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৌলভীবাজারে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার পরিধিও বাড়ছে। আবাসন, খাবার, পরিবহন, গাইডিং, বিনোদনসহ নানা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতের অবদানও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।ঘোষণায় বন্দী ‘পর্যটন জেলা’, নেই স্বীকৃতি:সম্ভাবনার এত বিস্তারের পরও মৌলভীবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া থমকে আছে। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন আজও জারি হয়নি।২০০৮ সালের ১ জুলাই ‘এসো বাংলাদেশ গড়ি’ রোড শো উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান শফিক আলম মেহেদী মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণা করেন।এর পরের বছর, ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ‘মৌলভীবাজার জেলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে উন্নীতকরণ’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রস্তাবে জেলার অনন্য বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়, পর্যটন শিল্পের জন্য মৌলভীবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে এলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আবাসন, বিনোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অনেক পর্যটক প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।বিমানবন্দর ও বিশেষ ট্রেনের দাবি:পর্যটন শিল্পের বিকাশে যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সহজ করার দাবি দীর্ঘদিনের। শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং পর্যটকদের জন্য ট্রেনে বিশেষ বগি চালুর দাবি জানিয়েছেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএইচএ) সভাপতি এম নাসের রহমান। জাতীয় সংসদেও তিনি মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছেন। জবাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর শ্রীমঙ্গল সফরকালে ১৭ জুন শ্রীমঙ্গলের জনসভায় মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরীও পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল মৌলভীবাজার পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি।বাংলাদেশ পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন অঞ্চল আইন, ২০১০-এর ৪ ধারা অনুযায়ী পর্যটন শিল্প রয়েছে বা পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন কোনো এলাকাকে প্রয়োজনবোধে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করতে পারে সরকার। একই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী পর্যটন সংরক্ষিত এলাকায় বিশেষ পর্যটন অঞ্চলও ঘোষণা করা সম্ভব।প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, চা-বাগান, হাওর, নদী, পাহাড়, বন, জলপ্রপাত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্য একসঙ্গে ধারণ করে আছে মৌলভীবাজার। পর্যটকের আনাগোনা ও পর্যটননির্ভর ব্যবসা বাড়লেও পরিকল্পিত অবকাঠামো, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।