সীমান্ত এলাকা জকিগঞ্জে পুলিশের সোর্স জামাল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার মিথ্যা মামলার অত্যাচারে ও চাঁদাবাজীতে অতিষ্ঠি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নানা অপকর্ম করে ঘুরে বেড়ালেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
পুলিশ সোর্স জামালের বিরুদ্ধে পুলিশের নামে মাদক থেকে টাকা কামাই, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদার টাকা না পেলে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে থানা হাজতে নিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরগ্রহণের মত নানা অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সিলেটের ডিআইজি বরাবরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছেন পৃথক দুই বিচারপ্রার্থী। অভিযোগকারীরা হলেন, জকিগঞ্জ ইউপির শিমেরবন্দ গ্রামের মৃত রইছ আলীর ছেলে হেলাল আহমদ ও বারঠাকুরী ইউপির কস্তইল গ্রামের মৃত ইয়াছিন আলীর ছেলে ছালেহ আহমদ।
লিখিত অভিযোগে ভূক্তভোগী হেলাল আহমদ দাবী করেন, গঙ্গাজল এলাকার জহির উদ্দিনের ছেলে জামাল নিজেকে র্যাব, পুলিশ ও ডিবি পুলিশের সোর্স দাবী করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভেঙে মাদক ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজী করে যাচ্ছে। চাহিদামত চাঁদার টাকা না পেলে একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো, পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে নির্যাতন করাসহ নানাভাবে হয়রানী করে থাকে। তার অত্যাচার, পুলিশ দিয়ে হয়রানী ও চাঁদাবাজীতে এলাকার লোকজন তটস্থ। পুলিশ সোর্স জামালের বিরুদ্ধে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়না। এতে দিনদিন সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কয়েকদিন আগে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করেছিলো জামাল। পরে হয়রানী থেকে রেহাই পেতে ভয়ে চাঁদার কিছু টাকা জামালকে দেবার পর বাকি টাকা দিতে না পারায় হেলালের নিরপরাধ দিনমজুর ভাই শাহজাহান আহমদকে দুটি মিথ্যা মামলায় আসামী করে ফেরারী দিন কাটাচ্ছে জামাল। এমতাবস্থায় শাহজাহানের পরিবার অনহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জামালের অপকর্মের বিরুদ্ধে কারো কথা বলার সাহস নেই। প্রতিবাদ করলেই পড়তে হয় হয়রানীর মুখে। ভয়ে নিশ্চুপ সাধারণ সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, উত্তরকুল গ্রামের মৃত ইয়াছিন আলীর ছেলে দিনমজুর ছালেহ আহমদ পুলিশ সোর্স জামালের হয়রানীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করায় জামাল গত ২৩/১০/২০১৯ সালে তাকে বিনা মামলায় পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে থানায় নিয়ে ৩দিন হাজতে রেখে চোখবেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। এরপর ছালেহ আহমদের স্ত্রী রাবিয়ার কাছে ১ লাখ টাকা দাবী করে জামাল। টাকা না দিলে ডাকাতি মামলায় ছালেহকে চালান করাবে বলে জানায়। পরে রাবিয় তার স্বামীকে ডাকাতি মামলা থেকে বাঁচাতে ৩৫ হাজার টাকা দেয়। বাকি টাকা ছালেহ জামিনে বেরিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দিয়েছেলো জামালকে। এ আশ্বাসের প্রেক্ষিতে জামাল হাজতে গিয়ে ছালেহ আহমদের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে রাখে। এরপর ২৬/১০/২০১৯ তারিখ ছালিক আহমদকে ১৫১ ধারায় আটক দেখিয়ে পুলিশ দিয়ে আদালতে প্রেরণ করায় জামাল। কিন্তু ছালেহ আহমদ জামিন পাওয়ার পর জামালের দাবীকৃত চাঁদার বাকি টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। এ কারণে আবারও হয়রানী শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত গত ২২/০৪/২১ ইংরেজী তারিখে সাজানো, কাল্পনিক, মিথ্যা হয়রানীমূলক মামলায় দিনমজুর শাহজাহান ও ছালেহ আহমদকে ফাঁসিয়েছে জামাল। মিথ্যা কাল্পনিক ঘটনার সাথে শাহজাহান জড়িত না থাকার বহু স্বাক্ষী প্রমাণ ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থাকার পরও জামাল চাঁদার কারণে হয়রানী করে যাচ্ছে। তাছাড়াও সুলতানপুর ইউপির খাদিমান গ্রামের নিরীহ অসহায় কবির আহমদ নামের এক ব্যক্তিকে হয়রানী করেছে জামাল। কবিরের কাছেও চাঁদা দাবী করে চাহিদা মত টাকা না পেয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হেনাস্তা করেছে এই ভয়ঙ্কর পুলিশ সোর্স।
অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, জকিগঞ্জ থানার সাবেক এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা, দারোগা, র্যাব ও ডিবি পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে জামালের গভীর সখ্যতা থাকার কারণে সাধারণ নিরীহ মানুষের কাছে নিজেকে সোর্স হিসেবে পরিচয় দেয়। সে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অসহায় সাধারণ মানুষ ও সীমান্তের দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। চাঁদা কালেকশনের জন্য জামালের নিজস্ব^ বাহিনীও রয়েছে।
অপরদিকে, আরেক বিচারপ্রার্থী বারঠাকুরী ইউপির কস্তইল গ্রামের ছালেহ আহমদ পুলিশের সোর্স জামালের নানা অপকর্ম ও মুক্তিপন আদায়ের বর্ণনা দিয়ে ডিআইজি বরাবরে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, জামাল ও তার সুন্দরী বধূ মিলে ৩টি মিথ্যা মামলায় তাদের এক সময়ের ঘনিষ্ট বন্ধু আব্দুর রহমানকে চার্জশীটভূক্ত করিয়েছে। চার্জশীটভূক্ত আব্দুর রহমান সালেহ আহমদের সর্ম্পকে ভায়রা হন। আব্দুর রহমান পলাতক থাকার কারণে সালেহ আহমদ তার পরিবারের খরচপাতি করে দিতেন। এ আক্রোশের জেরধরে জামাল পুলিশ দিয়ে তাকে বিনা মামলায় আটক করিয়ে ২ দিন হাজতে রেখে চোখ বেঁধে অমানবিক নির্যাতন করান। পরে সালেহ আহমদের অভিভাবকরাসহ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মহসিন মর্তুজা চৌধুরী থানায় গিয়ে পুলিশের হাতে পায়ে ধরেন। একপর্যায়ে তৎকালীন ওসি বিষয়টি নিয়ে জামালের সাথে কথা বলতে জানান। তখন জামালের সাথে কথা বললে জামাল তাদের কাছে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপন দাবী করে। পরে জামালের হাতে পায়ে ধরে নগদ ৩৫ হাজার টাকা ও পরে আরও ১ লক্ষ টাকা মুক্তিপন দেয়ার গ্যারান্টি হিসেবে থানা হাজতে সাদা স্ট্যাম্পে সালেহ আহমদের সই নেন। পরবর্তীতে সাদা স্ট্যাম্প উদ্ধার করতে চেষ্ঠা করেন সালেহ আহমদ। এ নিয়ে জামাল ও সালেহ আহমদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এর জেরে আরও একটি মিথ্যা মারামারি মামলায় সালেহ আহমদকে জড়িয়ে হাজতবাস করিয়েছে জামাল।
তিনি আরও বলেন, জামাল পুলিশের ছত্রছায়ায় থেকে জকিগঞ্জ থানার বিকল্প অফিসার ইনচার্জ হয়ে উঠেছিলেন। পুলিশের নামে সব ধরণের চাঁদা আদায়, মামলার তদবিরসহ লেনদেন করেন জামাল। এলাকায় কাকে ধরাবেন, কাছে ছাড়াবেন এসবের ঠিকাদারী ছিলো জামালের কাছে। এ নিয়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রেহানা পারভীন সিলেটের ডিআইজ বরাবরে কয়েকদিন আগে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সালেহ আহমদ অভিযোগে দাবী করেন, জামাল এখনো তাকে হুমকি ধমকি দিয়ে বলতেছে মুক্তিপনের ১ লক্ষ টাকা না দিলে সইযুক্ত সাদা স্ট্যাম্প ব্যবহার করে সালেহ আহমদকে আরও ১০ টি মামলায় ঢুকাবে। এমতাবস্থায় তিনি অনিরাপত্তায় ভূগছেন। তিনি তার সইযুক্ত সাদা স্ট্যাম্প উদ্ধারে ও মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জামাল আহমদ বলেন, মুক্তিপনের জন্য নয় নিজের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে সালেহ আহমদের কাছ থেকে একটি লিখিত স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছেন। হেলাল আহমদ ও ছালেহ আহমদের কাছে চাঁদা দাবীসহ নিরীহ মানুষকে হয়রানীর অভিযোগগুলো মিথ্যা। জামাল নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে দাবী করেন।
সূত্র: দৈনিক শ্যামল সিলেট
মতামত