ই-রিকশা নিবন্ধনে প্রস্তুতি নিচ্ছে সিসিক
বেপরোয়া গতি, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও একের পর এক দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ই-রিকশা। এসব যানবাহন পুরোপুরি বন্ধ করা, নাকি নীতিমালার আওতায় এনে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল আলোচনা। অবশেষে নির্দিষ্ট শর্তে দেশের সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা এলেও প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এতে নগরীতে চলাচলরত ৩০ হাজারের বেশি ই-রিকশার নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২৯ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে ১ নভেম্বর থেকে ই-রিকশা নিবন্ধনের আবেদন গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিতে থাকবেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, ট্রাফিক পুলিশের প্রতিনিধি, বুয়েট বা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যান্ত্রিক ও ইলেকট্রিক বিভাগের প্রতিনিধি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।কমিটি ই-রিকশার যান্ত্রিক ও কারিগরি দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন থেকে নিবন্ধন ও চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হবে।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ১ নভেম্বর থেকে নিজ নিজ সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা নিবন্ধনের আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি সিটি করপোরেশনে এ কার্যক্রম শুরু হলেও সিলেটে এখনো দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেই। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিবন্ধন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অংশীজনদের নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বয় সভা করেনি সিসিক। ফলে সিলেটে কবে নাগাদ আবেদন গ্রহণ শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম এ কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। কোন এলাকায় কতটি রিকশা চলাচল করবে, তা নির্ধারণ করে সেই অনুপাতে অনুমোদন দেওয়া হবে।’অন্যদিকে, ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘ই-রিকশা নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। তবে সিটি করপোরেশন থেকে এখনো লিখিত বা মৌখিক কোনো আহ্বান পাইনি। তারা যখনই আমাদের সঙ্গে বসতে চাইবে কিংবা সহযোগিতা চাইবে, আমরা তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।’সংশ্লিষ্ট সূত্র ও চালক-মালিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট নগরীতে বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে। বিপুলসংখ্যক এসব যানবাহনের মধ্যে কতটিকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। ছোট আয়তনের সিলেট নগরীর সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে অতিরিক্ত যানবাহনকে অনুমোদন দেওয়া হলে যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সীমিতসংখ্যক যানবাহন নিবন্ধনের সুযোগ পেলে বাকিগুলোর অবৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের সিলেট মহানগরের উপদেষ্টা আবু জাফর সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ই-রিকশা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে অবশেষে আমরা বৈধতা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। তবে লাইসেন্স প্রাপ্তি নিয়ে কোনো জটিলতা, দলীয়করণ বা দুর্নীতি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদেরসহ সব অংশীজনের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।’নতুন সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে চালকদের মধ্যেও। নগরীর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক ফয়সাল বলেন, ‘সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আমরা বৈধভাবে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাব। এতে পুলিশি হয়রানিও অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছি।’তবে শুধু নিবন্ধন দিলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না বলে মনে করেন হিউম্যান রাইটস জার্নালিস্ট কমিশনের সভাপতি ফয়সাল আহমদ বাবলু। তিনি বলেন, ‘শুধু অনুমোদন দিলেই হবে না, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে যেই লাউ, সেই কদু। বেপরোয়া গতি ও দুর্ঘটনা—কোনোটিই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’যেভাবে পাওয়া যাবে নিবন্ধনসিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার জারি করেছে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’। নতুন বিধিমালায় নিবন্ধন, নবায়ন, ফিটনেস, গতিসীমা ও চলাচলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে ২০২৫ সালের আগের বিধিমালা।নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশা নিবন্ধনে এককালীন ৮ হাজার টাকা এবং চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য ১০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া সব ধরনের ই-রিকশার জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ফিটনেস ফি দিতে হবে। নিবন্ধিত গাড়ির জন্য বিনা মূল্যে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও ব্লু-বুক সরবরাহ করবে সিটি করপোরেশন।একজন মালিক তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকবে।নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় এ সীমা ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি লেন ও ফুটপাতে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।সব মিলিয়ে নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাই এখন সিসিকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত সমন্বয় করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে নতুন বিধিমালার সুফল পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।