বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আর্থিক বছর ২০২৬-২৭। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-অগাস্ট) দেশে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি (৩.৮২ বিলিয়ন) ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য (বিওপি) সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই-অগাস্ট সময়ে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ১,২২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২.১০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় ৫.৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলারে। তবে রপ্তানি বৃদ্ধির হারের চেয়ে আমদানি ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে।অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠাই এই ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ। তথ্যমতে, আলোচিত দুই মাসে কেবল জ্বালানি তেল আমদানিতেই ২৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় শতভাগ বা দ্বিগুণ বেশি। যদিও এই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২০ শতাংশ এবং চাল আমদানি প্রায় ৭৮.৩০ শতাংশ কমেছে।বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয় ও লেনদেনের সমন্বয়ে অর্থবছরের শুরুতেই চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের কিছুটা স্বস্তিদায়ক উদ্বৃত্ত দেখা গেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূলধনী প্রবাহ ও বিনিয়োগ নির্দেশক ‘আর্থিক হিসাব’ (Financial Account)-এ ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (Overall Balance) ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু করতে হলো বাংলাদেশকে।ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করে চলে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাণিজ্য ঘাটতিতে নিম্মমুখী প্রবণতাই দেখা যায়।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৯ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৫ কোটি ডলারে নেমেছিল। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার।২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি ডলার।অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৩ হাজার ৩২৫ কোটি ডলারে উঠেছিল।লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত ৬০ কোটি ডলারবাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট-বিওপি) উদ্বৃত্ত নিয়ে শুরু হয়েছে অর্থবছর।২০২৬-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই দুই মাসে উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল অর্থবছর।২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।আর্থিক হিসাবে ঘাটতিব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) বড় ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে অর্থবছর। দুই মাসেই (জুলাই-অগাস্ট) ঘাটতি ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর।৩৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল।২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।সামগ্রিক লেনদেনেও ঘাটতিসামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর। এই আর্থিক বছরের জুলাই-অগাস্টে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।৬৬০ কোটি ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৩৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে।আর ৪৩০ কোটি ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছর।এফডিআই কমেছেচলতি অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ কম।২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের এই দুই মাসে ২৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। পুরো অর্থবছরে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন) ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ (১.৪৬ বিলিয়ন) ডলারের নিট এফডিআই এসেছিল, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।