বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩
সিলেটের বার্তা ২৪

জৈন্তাপুরে চেকপোস্ট ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ওসি মোল্লা

সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুরে হরিপুর চেকপোস্ট ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।যানবাহন আটকে অর্থ আদায়, সীমান্ত চোরাচালানে মদদ, জব্দ করা বিপুল পরিমাণ পণ্য আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও দাবি করছেন স্থানীয় নেতারা।এই ঘটনার প্রতিবাদ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গণজমায়েতের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর চেকপোস্টে পণ্যবাহী যানবাহন থেকে পুলিশের নামে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। গাড়িপ্রতি এক হাজার টাকা নেওয়ার পাশাপাশি একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে আরও দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো গাড়িকে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।গত ৩০ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে হেমু এলাকার বেলপাড়া গ্রামের পরিবহনচালক সালেহ পণ্য নিয়ে হরিপুর চেকপোস্ট অতিক্রম করার সময় অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান।এ সময় পুলিশ ও তাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের হাতে তিনি এবং গাড়িতে থাকা আরও দুজন মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, চেকপোস্টে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রকে পুলিশের পক্ষ থেকেই সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে ওই চক্রের সদস্যরা ব্যবসায়ী ও পরিবহনচালকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে।নেতাকর্মীরা জানান, ঘটনার পর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুর রশিদের নির্দেশনায় ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা থানায় গিয়ে ওসির কাছে অভিযোগ জানান এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন। তবে তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।এমনকি গত ২ নভেম্বর রাত ১টার দিকে হরিপুর চেকপোস্টে পুলিশ সদস্যদের কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে অবস্থান করে একের পর এক গাড়ি থামিয়ে অর্থ আদায় করতে দেখা গেছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।চেকপোস্টের অর্থ আদায় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. শোয়েব উদ্দিন বলেন, পুলিশের সহযোগিতায় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র চাঁদা আদায় করছে।তিনি জানান, সম্প্রতি এক ব্যবসায়ী তাদের কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশের নিয়মিত অর্থ আদায়ের বাইরেও অতিরিক্তভাবে ‘বিএনপির টাকা’ দাবি করা হচ্ছে। ওই ব্যবসায়ী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে যুবদল নেতা সুইট ফারুক ও ছাত্রদল নেতা শাহীন আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তাদের সম্মতি ছাড়া গাড়ি ছাড়ানো সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।শোয়েব উদ্দিনের ভাষ্য, বিষয়টি জানার পর তৃণমূল নেতাকর্মীরা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এসআই শামীমের কাছে ব্যাখ্যা চান। একপর্যায়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান বলে দাবি করেন শোয়েব।তার অভিযোগ, বৈধ পণ্যবাহী গাড়ি কিংবা চোরাচালানের পণ্য বহনকারী যানবাহন—কোনোটিই এই অর্থ আদায়ের আওতার বাইরে থাকছে না। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং পুলিশের কথিত অর্থ আদায় বন্ধের দাবিতে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।বিএনপি নেতা ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ইলিয়াস বলেন, চেকপোস্টে গাড়িপ্রতি টাকা আদায়ের বিষয়টি দায়িত্বে থাকা এএসআই শামীম উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুর রশিদের সামনে স্বীকার করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।তার দাবি, আগে গাড়িপ্রতি এক হাজার টাকা নেওয়া হলেও সম্প্রতি একটি চক্র এর সঙ্গে আরও দুই হাজার টাকা যুক্ত করে মোট তিন হাজার টাকা দাবি করায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।ইলিয়াস আরও বলেন, এএসআই শামীম নেতাদের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করছেন এবং পুরো বিষয়টি ওসির নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে ওসির কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।ইলিয়াসের দাবি, বিএনপির মূলধারার কোনো নেতাকর্মী এ ধরনের অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশের একটি অংশ এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তির যোগসাজশে বিএনপিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে।তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে বৈঠক হবে। তদন্তে দলের কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবিতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপিহরিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হক বলেন, পুলিশ নিজেরাই অর্থ আদায় করে তার দায় বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে একটি চক্রকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।তার প্রশ্ন, প্রশাসন যদি জানে কারা চেকপোস্টে অর্থ আদায় করছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব গণজমায়েতের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, তিনি কয়েক দিন এলাকার বাইরে ছিলেন। তবে হরিপুর চেকপোস্টের ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।তিনি বলেন, বিএনপিতে কোনো চাঁদাবাজ কিংবা সন্ত্রাসীর জায়গা নেই। দলের কারও বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করা হবে।জব্দ করা ভারতীয় পণ্য আত্মসাতের অভিযোগওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে শুধু চেকপোস্টে অর্থ আদায়ের অভিযোগই নয়, সীমান্ত থেকে জব্দ করা পণ্য আত্মসাতেরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় সূত্রের দাবি, সম্প্রতি সারিঘাট এলাকায় ভারতীয় শাড়িবোঝাই একটি ট্রাক আটক করা হলেও জব্দ তালিকায় পুরো চালান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় কোটি টাকার বেশি মূল্যের পণ্যের একটি বড় অংশ হিসাবের বাইরে রেখে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় লাইনম্যান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে পণ্য ভাগাভাগির অভিযোগও রয়েছে।একইভাবে কিছুদিন আগে ‘ভয়ংকর এক্সপ্রেস’ লেখা একটি বড় ট্রাক থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মদ উদ্ধারের পর চালানের একটি অংশ সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে।এ ছাড়া জৈন্তাপুর বাজার দিয়ে প্রবেশ করা ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষের চালান থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন এবং সীমান্ত দিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয় সূত্র আরও দাবি করেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থের বিনিময়ে সীমান্ত দিয়ে কিছু ব্যক্তির অবৈধ যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া এবং স্থানীয় রিসোর্টে চোরাচালান-সংশ্লিষ্ট গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করার অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট ওসির বিরুদ্ধে।তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথি বা জব্দ তালিকার তথ্য পাওয়া না গেলে সেগুলোকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।জরুরি বৈঠকে আন্দোলনের সিদ্ধান্তগত ২ নভেম্বর ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হক মেম্বারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ইলিয়াসের সঞ্চালনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা একটি বিতর্কিত চক্রকে প্রশ্রয় দিয়ে এলাকায় অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করেছেন। পরে এসব কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে।সভা থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত, চেকপোস্টে অর্থ আদায় বন্ধ, জব্দ করা মালামালের হিসাব প্রকাশ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।এসব দাবিতে বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গণজমায়েতের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে জৈন্তাপুর থাভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন- "আমি বক্তব্য দিব না। হরিপুর চেকপোস্টে কি আমি ডিউটি করি?”একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, তার সামনে পুলিশ সুপার (এসপি) উপস্থিত রয়েছেন।এ ব্যাপারে সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে কোনো বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে সরাসরি অফিসে যেতে বলেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জবাবদিহি এবং জব্দ করা মালামালের প্রকৃত হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।তথ্যসূত্র: দৈনিক শ্যামল সিলেট 

জৈন্তাপুরে চেকপোস্ট ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ওসি মোল্লা