ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নেওয়া প্রবাসজীবনেরও যেন এক নিত্যদিনের অভ্যাস। পৃথিবীর খবর জানার আগেই দেশের খবর খুঁজি। হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের প্রতিটি ঘটনা আমাদের ভেতরে ঢেউ তোলে। শরীরটা হয়তো অন্য দেশের মাটিতে, কিন্তু মন পড়ে থাকে সেই চেনা মাটিতে যেখানে শৈশব, স্মৃতি, পরিবার আর শেকড়ের গন্ধ লেগে আছে। প্রবাসে বসবাস করতে গিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের প্রয়োগের নানা কাঠামো চোখের সামনে কাজ করতে দেখি। তাই নিজের দেশে কোন মানুষের ওপর হামলা, কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর কিংবা সম্পদ লুটের খবর সামনে এলে সেটি আর শুধু একটি সংবাদ থাকে না। সেটি ধীরে ধীরে একটি প্রশ্নে পরিণত হয়, একজন সাধারণ মানুষ কি তার কাজ, সম্পদ ও স্বপ্ন নিয়ে নিরাপদে দাঁড়াতে পারেন?
সাম্প্রতিক সময়ে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলার ঘটনা সেই প্রশ্নটিকে আবার সামনে এনেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। স্টুডিওটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বলেছে, স্টুডিওটি মূল লক্ষ্য ছিল না; বরং বিরোধের মধ্যে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সালমান মুক্তাদির চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলেছেন। পরবর্তী প্রতিবেদনে পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে এবং অস্ত্র ও আলামত উদ্ধারের কথাও এসেছে। অতএব, ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত, প্রমাণ ও আদালতের প্রক্রিয়া। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তদন্তের অপেক্ষা রাখে না-কোন বিরোধের সমাধানের পথ কি ভাঙচুর, অস্ত্র, ভয় দেখানো কিংবা লুটপাট হতে পারে?
সভ্য রাষ্ট্রের উত্তর হওয়া উচিত-না। কারণ বিরোধেরও একটি ভাষা আছে। সেই ভাষা হলো আইন। কারও রাজনৈতিক পরিচয় কী, তিনি কতটা জনপ্রিয়, তাঁর সামাজিক অবস্থান কী, এসবের সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তার অধিকার বদলে যাওয়ার কথা নয়। একজন পরিচিত কনটেন্ট নির্মাতা এবং একজন অচেনা ছোট ব্যবসায়ী দুজনের পরিচিতি এক নয়, কিন্তু নিরাপত্তার অধিকার একই। আইনের সৌন্দর্য এখানেই। আইন মানুষের পরিচয় দেখে তার দরজা খুলবে বা বন্ধ করবে না। সালমান মুক্তাদিরের ঘটনাটিকে তাই শুধু একজন পরিচিত কনটেন্ট নির্মাতার স্টুডিও ভাঙচুর হিসেবে দেখলে হয়তো এর গভীরতর প্রশ্নটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। একটি স্টুডিও মানে শুধু ক্যামেরা, কম্পিউটার, মাইক্রোফোন, চেয়ার কিংবা আলো নয়। সেখানে থাকে মানুষের সময়, শ্রম, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। সেখানে হয়তো কোন তরুণ প্রথমবার নিজের সৃষ্টিশীলতাকে পেশায় পরিণত করার সাহস পেয়েছে। কোন কর্মী হয়তো সেই কাজের আয় দিয়ে পরিবারের খরচ চালায়। কোন ক্লায়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেখানে সংরক্ষিত ছিল। কোন নির্মাতার বহুদিনের পরিশ্রম হয়তো একটি হার্ডড্রাইভের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল। ক্যামেরার দাম হিসাব করা যায়, কম্পিউটারের দাম হিসাব করা যায়, ভাঙা আসবাবের দামও হিসাব করা যায়। কিন্তু একজন মানুষের ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের দাম কে হিসাব করবে?
এখানেই একটি স্টুডিওর ভাঙা দেয়াল আমাদের সময়ের আরেকটি বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আজকের তরুণ শুধু চাকরি খোঁজে না; অনেকেই নিজের কাজ নিজেই তৈরি করছে। কেউ কনটেন্ট নির্মাণ করছে, কেউ ফ্রিল্যান্সিং করছে, কেউ ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করছে, কেউ অনলাইন ব্যবসা করছে। একটি ক্যামেরা, একটি কম্পিউটার এবং একটি ইন্টারনেট সংযোগও এখন অনেকের কাছে কর্মক্ষেত্রের দরজা খুলে দিতে পারে। অর্থনীতির নতুন দরজা খুলতে সময় লাগে। কিন্তু একটি দরজা ভেঙে দিতে লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। তাই কোন স্টুডিওতে হামলা শুধু কয়েকটি যন্ত্রপাতির ক্ষতির হিসাব নয়। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছি, যেখানে একজন তরুণ তার মেধা, শ্রম ও পুঁজি নিয়ে নিশ্চিন্তে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে? কারণ ভয়ও এক ধরনের অদৃশ্য কর। একজন উদ্যোক্তা যদি প্রতিদিন হিসাব করতে বাধ্য হয়-ব্যবসার লাভ কত, আর নিরাপত্তার ঝুঁকি কত তাহলে অর্থনীতির খাতায় না থাকা একটি ক্ষতি তৈরি হয়। সেই ক্ষতির নাম আস্থার ক্ষয়। আর একটি দেশের অর্থনীতি শুধু টাকা দিয়ে চলে না; চলে আস্থা দিয়ে।
প্রবাসে বসে এই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দূরত্ব কখনো কখনো দেশকে আরও কাছে এনে দেয়। সকালে মোবাইলের পর্দায় দেশের ভালো খবর দেখলে মনে হয়, যেন দূরের কোন জানালা দিয়ে নিজের বাড়ির উঠোন দেখা যাচ্ছে। আবার কোন মানুষের আতঙ্ক, কোন প্রতিষ্ঠানের ভাঙা দরজা কিংবা লুটপাটের খবর দেখলে সেই জানালাটিই যেন কুয়াশায় ঢেকে যায়। তবে আবেগ দিয়ে বিচার নয়- প্রয়োজন তথ্য, তদন্ত ও জবাবদিহিতা। এই ঘটনায় কারা হামলা করেছে, কেন করেছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কারা অংশ নিয়েছে, কী পরিমাণ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক কী এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে বের হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে তারও আইনগত পরিণতি থাকা দরকার; অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। কারণ অভিযোগকে তদন্তের আগেই সত্য বানানো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি পরিচয়ের কারণে কোন অভিযোগকে অগ্রাহ্য করাও বিপজ্জনক। অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণে, পরিচয়ে নয়। এটাই আইনের সৌন্দর্য। সত্য কখনো গুজবের মতো দৌড়ে আসে না। সত্য ধীরে হাঁটে-প্রমাণের ভেতর দিয়ে, সাক্ষ্যের ভেতর দিয়ে, তদন্তের ভেতর দিয়ে। আর সত্যের জায়গায় যখন অনুমান বসে যায়, তখন একটি ঘটনার ভেতর থেকে আরও অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। হয়তো ব্রাউনফিশ স্টুডিও আবার তৈরি হবে, ভাঙা কাচ সরবে, নতুন ক্যামেরা আসবে, নতুন আলো জ্বলবে। আবার সেখানে মানুষের কণ্ঠ শোনা যাবে, কাজ হবে, হয়তো হাসিও ফিরবে। কিন্তু একটি সমাজের জন্য তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন মানুষ যেন নিজের স্বপ্নের জায়গা তৈরি করার আগে নিরাপত্তার প্রশ্নে থমকে না দাঁড়ায়।
আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মানুষ সফল হওয়ার আগে ভাবে আমি নিরাপদ তো? নাকি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মানুষ জানে বিরোধ হলে আদালত আছে, অন্যায় হলে আইন আছে, ভয় দেখানো হলে রাষ্ট্র আছে? একটি দেশের সভ্যতা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মাপা যায় না। সভ্যতার আসল পরীক্ষা হয় আরও নীরব কোন মুহূর্তে-যখন একজন সাধারণ মানুষ রাতের দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। যখন একজন উদ্যোক্তা নিজের প্রতিষ্ঠান খুলে বিশ্বাস করতে পারে-তাঁর শ্রম রাতের অন্ধকারে কেউ এসে ধ্বংস করে দেবে না। একটি স্টুডিও ভাঙার শব্দ হয়তো এক রাতেই থেমে যায়। কিন্তু সেই শব্দে যদি মানুষের নিরাপত্তাবোধে চিড় ধরে, তার প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। কখনো কখনো একটি ভাঙা ক্যামেরা শুধু একটি যন্ত্রের মৃত্যু নয়; সেটি একটি মানুষের স্বপ্নে পড়া ছায়ার শব্দ। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই ছায়ার ভেতরেও আইনের আলো পৌঁছে দেওয়া।
মতামত