মাটির টানে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন তাঁরা। কেউ এসেছিলেন বেড়াতে, কেউ স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে, আবার কেউ এসেছিলেন নিজের জমি-জমা ও পারিবারিক বিষয় দেখভাল করতে।
কিন্তু স্বদেশে ফেরার পর তাঁদের কয়েকজনের পরিণতি হয়েছে নির্মম হত্যাকাণ্ডে। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে নিহত ৯ ব্রিটিশ-বাংলাদেশির মধ্যে ৮ জনই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা বা সিলেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
একই সময়ে সিলেটের ওসমানীনগরে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুসহ আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। অথচ এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।
১৯৯৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৯ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে আরও পাঁচজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকলেও বাকি পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ও পাঁচটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা এখনো নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
বিমানবন্দরে সুরত মিয়া হত্যাকাণ্ড
১৯৯৬ সালের ৯ মে ঢাকার বিমানবন্দরে হত্যার শিকার হন নিউক্যাসলের ৩৫ বছর বয়সী রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ সিরাজ ওরফে সুরত মিয়া। কেএলএমের ফ্লাইটে বাংলাদেশে নামার পর তাঁর কাছে থাকা ৪ হাজার পাউন্ড নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় চার কাস্টমস কর্মকর্তাকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও পরে প্রমাণের ঘাটতির কথা বলে তাঁরা অব্যাহতি পান।
সিলেট থেকে ঢাকায় গিয়ে নিখোঁজ, পরে মিলল লাশ
২০০১ সালের জুনে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মুঘল কুরাইশি বাংলাদেশে বেড়াতে এসে হত্যার শিকার হন। ইস্ট লন্ডনের স্ট্রাটফোর্ডে বসবাসকারী এই তরুণ সিলেট থেকে ঢাকায় যাওয়ার পর নির্ধারিত ট্রানজিট হোটেল থেকে নিখোঁজ হন। দুই দিন পর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশি তদন্তে পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এ হত্যার বিচার আজও হয়নি।
২০০৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয় লন্ডনপ্রবাসী দুলা মিয়াকে। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২২ সালে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
বিশ্বনাথে তাহির আলীর মৃত্যু
২০১১ সালের ২৬ জুন সিলেটের বিশ্বনাথে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে মুখোশধারীদের হামলায় নিহত হন রচডেলের প্রবীণ বাসিন্দা হাজি তাহির আলী। জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ঘটনার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার হয়নি।
সন্তানের সামনে রেহানা বেগমকে হত্যা
২০১৩ সালের ১৭ জুলাই স্বামী ও ১২ বছরের সন্তানকে নিয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাটলি গ্রামে আসেন স্টেপনি গ্রিনের বাসিন্দা রেহানা বেগম। ওই বছরের ২ আগস্ট ১২ বছর বয়সী সন্তানের সামনে তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বজনদের একটি অংশ সোনা ও টাকার জন্য তাঁকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি।
শ্রীমঙ্গলের রিহ্যাব সেন্টারে তরুণের লাশ
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি রিহ্যাব সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ জালাল উদ্দিনের লাশ। চিকিৎসার জন্য পরিবার তাঁকে সেখানে ভর্তি করেছিল। পরে তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও বিচার হয়নি।
ওসমানীনগরে পরিবারের পাঁচজনের রহস্যজনক মৃত্যু
২০২২ সালের জুলাইয়ে সিলেটের ওসমানীনগরে নিজ বাসায় রহস্যজনকভাবে মারা যান কার্ডিফের বাসিন্দা রফিকুল ও তাঁর স্ত্রীসহ পাঁচজন। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে কার্বন মনোক্সাইডের কারণে ঘুমের মধ্যে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করেছিল। তবে ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য সামনে আসেনি।
বিয়ানীবাজারে ভাইয়ের হাতে প্রবাসী নিহত
২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে আপন ভাইয়ের হাতে নিহত হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জালাল উদ্দিন (৫৫)। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁকে স্বজনরা পিটিয়ে হত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে হৃদ্রোগে মৃত্যু হিসেবে দেখিয়ে দ্রুত দাফন করা হয়। যুক্তরাজ্যে থাকা তাঁর পরিবার বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলে দুই মাস পর লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তে আঘাতের কারণে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসে। এ ঘটনায় প্রধান আসামি সুনাম উদ্দিনকে আটক করা হলেও মামলার অগ্রগতি নিয়ে নিহতের পরিবারের অভিযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ সুরমায় আব্দুল কাইয়ূম হত্যা
২০২৪ সালের ৭ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার থানার রুস্তমপুর তলপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির উঠানে ছুরিকাঘাতে নিহত হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুল কাইয়ূম (৪৫)। প্রতিবেশী চাচার সঙ্গে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। হত্যার সময় বাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী মামলা করলেও এখনো অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জকিগঞ্জে নিখোঁজের পর বোরহানের লাশ
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসার তিন দিনের মাথায়, ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিন শফি। নিখোঁজের তিন দিন পর সিলেটের জকিগঞ্জে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি পোড়ানো অবস্থায় ছিল। এ ঘটনায় মূল আসামিকে আটক করা হয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে মামলার ধীরগতিতে নিহতের পরিবার হতাশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটের সঙ্গে ব্রিটেনের গভীর সম্পর্ক
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সিলেটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকও বলেছেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের প্রায় ৯০ শতাংশের শিকড় সিলেটে। ফলে যুক্তরাজ্য ও সিলেটের মধ্যে একটি বিশেষ ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেই সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রবাসী সিলেটিরা। কিন্তু মাটির টানে দেশে ফিরে তাঁদের কেউ যদি হত্যার শিকার হন কিংবা রহস্যজনকভাবে মারা যান, আর বছরের পর বছর সেই ঘটনার বিচার না হয়—তাহলে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, প্রবাসী সমাজের মধ্যেও নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। সিলেটের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এই গভীর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের হত্যাকাণ্ড ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।